মঙ্গলবার , ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ | ২৯ পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রকাশিত: ০৩:৪৫ ১ অক্টোবর ২০২৫
গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীরে নানাবিধ শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে হরমোনের ওঠানামা দেহের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনি চোখেও এর বিশেষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। অনেক পরিবর্তন প্রসবের পর স্বাভাবিক হয়ে গেলেও কিছু সমস্যা স্থায়ী জটিলতায় রূপ নিতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় চোখের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
গর্ভাবস্থায় শরীরে জলীয় অংশের পরিমাণ বেড়ে গেলে চোখের কর্নিয়াতেও পরিবর্তন আসে। এতে কর্নিয়া মোটা ও বেশি বাঁকানো হয়ে ওঠে, ফলে রিফ্রেকশনে সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণত হালকা মায়োপিয়া বা দূরের জিনিস ঝাপসা দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। যদিও এই পরিবর্তন প্রসব-পরবর্তী সময়ে নিজে থেকেই সেরে যায়, তবুও প্রয়োজনে সাময়িক চশমা ব্যবহার করা যেতে পারে।
ইস্ট্রোজেন ও প্রোলেক্টিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে চোখের পানি উৎপাদন কমে যায়, যা ড্রাই আই বা শুষ্ক চোখের সমস্যা সৃষ্টি করে। এর ফলে চোখ লাল হওয়া, খচখচ ভাব বা জ্বালাপোড়া দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আর্টিফিশিয়াল টিয়ার বা চোখের ড্রপ ব্যবহার করা প্রয়োজন।
যাঁদের ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি আগে থেকেই ছিল, তাঁদের জন্য গর্ভাবস্থা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ। হরমোনের প্রভাবে এ রোগ আরও বেড়ে যেতে পারে এবং চোখে রক্তক্ষরণ হয়ে স্থায়ী অন্ধত্বের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবার হঠাৎ করে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টাও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই ডায়াবেটিস গর্ভাবস্থার আগেই নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত চক্ষুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
হাইপারটেনসিভ রেটিনোপ্যাথি বা উচ্চ রক্তচাপজনিত চোখের সমস্যা থাকা নারীরাও ঝুঁকিতে থাকেন। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে অন্ধত্বের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। তাই নিয়মিত চোখ পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
এ ছাড়া কর্টিসোল ও কেটাকোলামাইন হরমোনের প্রভাবে রেটিনায় তরল জমে সেন্ট্রাল সেরাস কোরিও রেটিনোপ্যাথি দেখা দিতে পারে। এতে হঠাৎ দৃষ্টির সমস্যা হতে পারে এবং চিকিৎসা না নিলে তা স্থায়ী ক্ষতিতে রূপ নিতে পারে।
গ্লুকোমা রোগীদেরও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। গ্লুকোমা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কিছু চোখের ড্রপ—যেমন বিটা ব্লকার, প্রোস্টাগ্লেন্ডিন অ্যানালগ ও আলফা-২ এজেন্ট—গর্ভাবস্থায় ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এসব ওষুধ গর্ভস্থ শিশুর হৃদস্পন্দন কমিয়ে দিতে পারে এবং শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, গর্ভাবস্থায় যদি হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা দেয় বা দৃষ্টি কমে যায়, তবে বিষয়টি অবহেলা করা যাবে না। দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, গর্ভাবস্থায় শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো চোখেও নানাবিধ পরিবর্তন ঘটে। এর বেশিরভাগই সাময়িক হলেও কিছু সমস্যা গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এ সময়ে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা, ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই চোখের সুস্থতা বজায় রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
