মানবদেহে রক্তের কাজ অপরিসীম। রক্ত কেবল একটি লাল রঙের তরল পদার্থ নয়, বরং এটি একটি তরল যোজক কলা (Fluid Connective Tissue) যা আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে পুষ্টি ও অক্সিজেন পৌঁছে দেয় এবং শরীরকে সচল রাখে। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে সাধারণত ৫-৬ লিটার রক্ত থাকে, যা দেহের মোট ওজনের প্রায় ৭-৮%।
নিচে মানবদেহে রক্তের কাজগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. পরিবহন সংক্রান্ত কাজ (Transportation Functions)
রক্তের প্রধান কাজ হলো শরীরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রয়োজনীয় উপাদান পরিবহন করা।
শ্বসন গ্যাস পরিবহন (O₂ ও CO₂): রক্তের লোহিত কণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিন ফুসফুস থেকে অক্সিজেন (O₂) গ্রহণ করে দেহের প্রতিটি কোষে পৌঁছে দেয়। আবার, কোষের বিপাকীয় কার্যের ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) রক্তরসের মাধ্যমে ফুসফুসে নিয়ে আসে এবং শরীর থেকে বের করে দেয়।
খাদ্যসার পরিবহন: পরিপাকতন্ত্র থেকে শোষিত খাদ্যসার (যেমন—গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও মিনারেলস) রক্তরসের মাধ্যমে বাহিত হয়ে দেহের প্রতিটি কলা ও কোষে পৌঁছায়।
হরমোন পরিবহন: শরীরের নালিবিহীন গ্রন্থি (Endocrine Glands) থেকে নিঃসৃত হরমোন সরাসরি রক্তে মিশে যায় এবং রক্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্গে (Target Organ) পৌঁছে সেখানকার কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন: কোষের বিপাক ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকর নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য (যেমন—ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, ক্রিয়েটিনিন) রক্ত কিডনিতে নিয়ে যায়, যা পরে প্রস্রাবের মাধ্যমে দেহ থেকে নির্গত হয়।
২. নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষা (Regulation & Homeostasis)
রক্ত শরীরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: রক্ত দেহের তাপ পরিবহনে সাহায্য করে। পেশি বা যকৃতে উৎপন্ন তাপ রক্তরসের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শরীর খুব গরম হয়ে গেলে রক্ত ত্বকের উপরিভাগে চলে আসে এবং তাপ বের করে দিয়ে শরীর ঠান্ডা রাখে।
অম্ল ও ক্ষারের ভারসাম্য (pH Balance): রক্তে বিভিন্ন বাফার (Buffer) পদার্থ থাকে (যেমন বাইকার্বোনেট), যা শরীরের pH-এর মান ৭.৩৫–৭.৪৫ এর মধ্যে স্থির রাখতে সাহায্য করে।
পানির সামঞ্জস্য রক্ষা: রক্ত রক্তরস ও কোষের মধ্যে পানির আদান-প্রদান ঘটিয়ে শরীরে পানির ভারসাম্য বা অভিস্রবণিক চাপ (Osmotic Pressure) নিয়ন্ত্রণ করে।
৩. প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কাজ (Protection & Immunity)
শরীরকে রোগজীবাণু ও আঘাত থেকে রক্ষা করতে রক্ত বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
রোগ প্রতিরোধ: রক্তের শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cells) হলো শরীরের প্রহরী। যখনই কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে, শ্বেত কণিকা ফ্যাগোসাইটোসিস (Phagocytosis) প্রক্রিয়ায় তাদের ধ্বংস করে এবং অ্যান্টিবডি (Antibody) তৈরি করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।
রক্ত জমাট বাঁধা (Coagulation): কোথাও কেটে গেলে বা আঘাত পেলে রক্তের অণুচক্রিকা (Platelets) এবং রক্তরসের ফাইব্রিনোজেন প্রোটিন সেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে, ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়।
একনজরে রক্তের উপাদান ও তাদের প্রধান কাজ
বোঝার সুবিধার্থে নিচে একটি ছক দেওয়া হলো:
রক্তের উপাদান
প্রধান কাজ
লোহিত রক্তকণিকা (RBC)
ফুসফুস থেকে অক্সিজেন কোষে পৌঁছে দেয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করে।
শ্বেত রক্তকণিকা (WBC)
রোগজীবাণু ধ্বংস করে এবং ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে।
অণুচক্রিকা (Platelets)
রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে।
রক্তরস (Plasma)
পানি, পুষ্টি, হরমোন এবং বর্জ্য পদার্থ পরিবহন করে।
মানবদেহ সচল রাখার জন্য রক্ত অনেকটা গাড়ির ইঞ্জিনে তেলের মতো কাজ করে। এটি একদিকে যেমন কোষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অক্সিজেন ও পুষ্টি যোগায়, অন্যদিকে শরীরের বর্জ্য পরিষ্কার করে এবং রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তাই রক্তে কোনো উপাদানের ঘাটতি দেখা দিলে (যেমন রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া) পুরো শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।