চলনবিলের ‘পল্লা উৎসব’: রাতের আঁধারে আলো ফেলে মাছ ধরার রোমাঞ্চ

চলনবিলের ‘পল্লা উৎসব’: রাতের আঁধারে আলো ফেলে মাছ ধরার রোমাঞ্চ

আলামিন হোসেন: তাড়াশ উপজেলা প্রতিনিধি
আলামিন হোসেন: তাড়াশ উপজেলা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০২:২০ ২৭ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল চলনবিল কেবল তার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবেও সমাদৃত। এই বিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানান প্রাচীন উৎসবের ধারাবাহিকতা। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘পল্লা উৎসব’, যা স্থানীয়দের কাছে এক রোমাঞ্চকর রাতের মাছ ধরার উৎসব হিসেবে পরিচিত।

বর্ষা শেষে যখন বিলের পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে, তখন এলাকার শৌখিন ও পেশাদার মৎস্য শিকারিরা দলবদ্ধভাবে রাতের আঁধারে মাছ ধরতে নামেন। হাতে থাকে শক্তিশালী টর্চলাইট বা বৈদ্যুতিক লাইট—যার আলোয় তারা বিলের জলে মাছ খুঁজে বেড়ান।

মাছের আলোর প্রতি এক ধরনের স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকে। ফলে আলো ফেললেই মাছ কাছে চলে আসে বা স্থির হয়ে থাকে। সেই মুহূর্তে জেলেরা দ্রুত ফেলে দেন তাদের বিশেষ জাল, যাকে বলা হয় ‘পল্লা’ বা ‘চৈতা’। এতে মুহূর্তেই ধরা পড়ে দেশি মাছ যেমন—শোল, টাকি, শিং, মাগুর ইত্যাদি।

রাতের নীরবতার মাঝে আলোর ঝলকানি, পানির শব্দ আর শিকারিদের হাঁকডাক—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। শিকারিদের কাছে এটি কেবল মাছ ধরার অভিজ্ঞতা নয়, বরং একধরনের আনন্দ উৎসব।

‘পল্লা উৎসব’ স্থানীয়দের কাছে শুধু মাছ ধরা নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগ ও বন্ধুত্বের এক উপলক্ষ। দলবদ্ধভাবে মাছ খুঁজতে গিয়ে তারা একে অপরের সঙ্গে গল্প করে, হাসি-ঠাট্টা করে রাতটাকে উৎসবে পরিণত করেন।

এ ছাড়া চলনবিল এলাকায় আরও একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব আছে—‘বাউত উৎসব’। এতে পল্লার বদলে জাল, পলো, চাঁই ইত্যাদি ব্যবহার করে দলবদ্ধভাবে মাছ ধরা হয়। দুটি উৎসবই চলনবিল অধ্যুষিত নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার মানুষের কাছে ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।

প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ঢেউয়ে যেমন অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি ‘পল্লা উৎসব’-এর প্রাণও কিছুটা নিভে আসছে। তারপরও স্থানীয়রা নিজেদের সংস্কৃতি ও আনন্দের উত্তরাধিকার ধরে রাখতে প্রতি বছর এই উৎসব আয়োজন করে আসছেন।

চলনবিলের ‘পল্লা উৎসব’ আজও গ্রামীণ জীবনের প্রাণবন্ত চিত্র বহন করছে—যেখানে আনন্দ, ঐতিহ্য ও প্রকৃতি মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/