লালন ও লোকনাথ: বিভেদের মধ্যেও ঐক্যের সাধনা

লালন ও লোকনাথ: বিভেদের মধ্যেও ঐক্যের সাধনা

নেহাল আহমেদ: বিশেষ প্রতিনিধি রাজবাড়ী
নেহাল আহমেদ: বিশেষ প্রতিনিধি রাজবাড়ী

প্রকাশিত: ০৩:২৬ ১৮ অক্টোবর ২০২৫

বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে লালন ফকির ও লোকনাথ ব্রহ্মচারী দুই দিকপাল সাধক, যাঁরা ভিন্ন পথে হেঁটে একেই লক্ষ্য অর্জনের সাধনা করেছেন—মানুষের আত্মমুক্তি ও চেতনার জাগরণ। একজন যুক্তি ও ভাবনার আলোয় মানবতার মুক্তির বার্তা দিয়েছেন, অন্যজন ভক্তি ও বিশ্বাসের মাধ্যমে দেখিয়েছেন ঈশ্বরপ্রেমের পথ। তাঁদের এই দুই ধারার সমন্বয়ই গড়ে তুলেছে বাংলার আত্মিক ঐতিহ্যের এক অনন্য সৌন্দর্য ও সহাবস্থান।

লালন ফকির (১৭৭৪–১৮৯০) ছিলেন মুক্তচিন্তার এক আলোকবর্তিকা। তিনি সমাজে প্রচলিত জাত, বর্ণ ও ধর্মভেদের দেয়াল ভেঙে মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন নিজেকে জানার পথে। তাঁর দর্শন ছিল মানবকেন্দ্রিক—“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।” লালনের মতে, ধর্ম বাহ্যিক আচার বা রীতিতে নয়, বরং নিহিত আছে মানুষের অন্তরে, যেখানে মানবতা ও প্রেমই আসল পূজার প্রতীক।

অন্যদিকে, লোকনাথ ব্রহ্মচারী (১৭৩০–১৮৯০) ছিলেন ঈশ্বরভক্তি ও ত্যাগের আদর্শ সাধক। শৈশব থেকেই ব্রহ্মচর্য, উপবাস, ধ্যান ও ঈশ্বরনাম স্মরণে নিমগ্ন ছিলেন তিনি। তাঁর জীবন একাগ্র ভক্তি, ত্যাগ ও করুণার প্রতীক। মানুষের দুঃখে তিনি কেঁদেছেন, তাঁদের মুক্তি কামনায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁর অনুসারীরা বিশ্বাস করেন—লোকনাথই আশ্রয়, যিনি বিশ্বাসীদের দুঃখ মোচন করেন এবং জীবনে শান্তি এনে দেন।

তাঁদের পথ আলাদা হলেও লক্ষ্য এক—মানুষের আত্মজাগরণ ও কল্যাণ। লালন যেমন জ্ঞানের আলোয় মুক্তির বার্তা দিয়েছেন, তেমনি লোকনাথ ভক্তির আগুনে সেই মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। লালনের কাছে মানুষই ধর্মের রূপ, আর লোকনাথের কাছে মানুষই ঈশ্বরের প্রতিফলন।

অতএব, লালন ও লোকনাথ আমাদের শেখান—মুক্তি আসে না বাহ্যিক আচারে বা ধর্মীয় পরিচয়ে, বরং আসে অন্তরের জাগরণে। তাঁরা দেখিয়েছেন, চিন্তা ও বিশ্বাস, যুক্তি ও ভক্তি—সবই একসূত্রে গাঁথা হতে পারে মানবতার সেবায়। বিভেদের মাঝেই তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছেন ঐক্যের এক চিরন্তন দর্শন, যা আজও আমাদের সমাজে সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবতার আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/