• রবিবার , ০৯ আগস্ট, ২০২৬ | ২৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও গণতন্ত্রের দীর্ঘ সংগ্রাম

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও গণতন্ত্রের দীর্ঘ সংগ্রাম

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩:৪৮ ৯ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে যেসব নেতার নাম বাদ দিয়ে দেশের রাজনীতি ব্যাখ্যা করা প্রায় অসম্ভব, বেগম খালেদা জিয়া তাঁদের অন্যতম। একজন সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে দীর্ঘ সময় জনজীবনের বাইরে থাকা থেকে শুরু করে একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া, একাধিকবার সরকার পরিচালনা, বিরোধীদলীয় রাজনীতি, কারাবাস, অসুস্থতা এবং জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত দেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ছিল গভীর।

চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ কয়েক দশক ধরে প্রভাবিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই দুই নেত্রীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে প্রায়ই বাংলাদেশের আধুনিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়েছে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন যেমন সাফল্য ও জনপ্রিয়তায় সমৃদ্ধ, তেমনি বিতর্ক, রাজনৈতিক সংঘাত এবং নানা অভিযোগেও পরিপূর্ণ। তাই তাঁর জীবনী শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর জীবনী নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ক্ষমতার পরিবর্তন, দলীয় মেরুকরণ এবং রাজনৈতিক সংগ্রামেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

জন্ম, পরিবার ও শৈশব

বেগম খালেদা জিয়ার জন্মতারিখ ও জন্মস্থান নিয়ে বিভিন্ন প্রামাণ্য উৎসে কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিএনপির আনুষ্ঠানিক জীবনীতে তাঁর জন্মতারিখ ১৫ আগস্ট ১৯৪৬ উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে Banglapedia-তে তাঁর জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯৪৫, তৎকালীন জলপাইগুড়িতে বলে উল্লেখ রয়েছে। ফলে তাঁর জন্মসাল নিয়ে ঐতিহাসিক নথিতে ভিন্নতা রয়েছে।

তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মা তৈয়বা মজুমদার। দেশভাগের পর পরিবারটি দিনাজপুরে বসতি স্থাপন করে। তাঁর পরিবারের আদি শিকড় বাংলাদেশের ফেনী অঞ্চলে বলে বিএনপির জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।

খালেদা জিয়া দিনাজপুরের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। Banglapedia অনুযায়ী তিনি Dinajpur Missionary School-এ প্রাথমিক পর্যায়ে পড়েন এবং পরে Dinajpur Girls’ School থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজেও পড়াশোনা করেন।

তখনও কেউ কল্পনা করেনি যে তুলনামূলকভাবে প্রচারবিমুখ এই তরুণী কয়েক দশক পরে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্বদের একজন হয়ে উঠবেন।

জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহ

১৯৬০ সালে খালেদা জিয়া তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং স্বাধীনতার পর দেশের রাষ্ট্রপতি হন।

বিয়ের পর খালেদা জিয়ার জীবন মূলত একজন সামরিক কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে কাটতে থাকে। স্বামীর কর্মস্থলের কারণে বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে থাকতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় তিনি প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে ছিলেন।

তাঁদের দুই ছেলে তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকো। পরবর্তী সময়ে তারেক রহমান বিএনপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন এবং ২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়া

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে।

মার্চ ১৯৭১-এ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। Banglapedia অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী খালেদা জিয়াকে হেফাজতে নেয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি মুক্তি পান।

এই সময়টি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি কঠিন অধ্যায়। একদিকে স্বামী যুদ্ধক্ষেত্রে, অন্যদিকে তিনি সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছিলেন।

স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। ফলে ধীরে ধীরে খালেদা জিয়ার জীবনও রাষ্ট্রীয় পরিসরের কাছাকাছি চলে আসে।

ফার্স্ট লেডি হিসেবে জীবন

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর খালেদা জিয়া দেশের ফার্স্ট লেডির ভূমিকা পালন করেন।

এই সময় তিনি স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিএনপির প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

তবে তখনও তিনি নিজে কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। রাজনীতির সামনের সারিতে তাঁর প্রবেশ ঘটে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতিতে।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ও জীবনের মোড় পরিবর্তন

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন।

এই হত্যাকাণ্ড খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনে গভীর আঘাত নিয়ে আসে। একই সঙ্গে এটি শেষ পর্যন্ত তাঁকে রাজনীতিতে প্রবেশের পথেও নিয়ে যায়।

স্বামীর মৃত্যুর পর বিএনপির মধ্যে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়। দলের নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং দলীয় ঐক্য রক্ষায় খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

একজন রাজনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ বিধবা নারী থেকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রী হয়ে ওঠার যাত্রা এখান থেকেই শুরু।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব

১৯৮২ সালের মার্চে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং দেশে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিও স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। যদিও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পৃথক জোটে আন্দোলন করছিল, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির চাপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়া একাধিকবার আটক হন। বিএনপির দলীয় জীবনী অনুযায়ী, এ সময়ে তাঁকে সাতবার আটক করা হয়েছিল।

অবশেষে ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদের শাসনের অবসান ঘটে। Banglapedia উল্লেখ করে, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটগুলোর আন্দোলনের ফলে এরশাদ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন এবং বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গঠিত হয়।

এই আন্দোলন খালেদা জিয়াকে জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৯১ সালের নির্বাচন ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এই নির্বাচনে বিএনপি সংসদের বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরপর ২০ মার্চ ১৯৯১ খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

একজন নারী এমন সময়ে দেশের সরকারপ্রধান হন, যখন দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ আজকের তুলনায় অনেক বেশি সীমিত ছিল।

খালেদা জিয়ার ক্ষমতায় আসা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি নতুন অধ্যায়েরও সূচনা করে।

রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন

খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অর্জনগুলোর একটি ছিল সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন।

১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় চলে গিয়েছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর ঐকমত্যে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাস হয়।

এর ফলে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যকর নির্বাহী সরকারপ্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। খালেদা জিয়া ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ নতুন সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবার শপথ নেন।

এ কারণে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইতিহাসে তাঁর প্রথম সরকারের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম সরকারের শিক্ষা ও সামাজিক উদ্যোগ

১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের সরকার পরিচালনার সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া হয়।

Banglapedia অনুযায়ী, এ সময়ে বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ, ছাত্রীদের উপবৃত্তি এবং Food for Education কর্মসূচির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় উৎসাহ প্রদানের নীতি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।

Reuters-এর তাঁর মৃত্যুসংক্রান্ত জীবনীমূলক প্রতিবেদনে ১৯৯০-এর দশকে তাঁর সরকারের শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতিকে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরও উন্মুক্ত করার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার শুরু

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা একই বৃহত্তর লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন করলেও ১৯৯১-এর পর তাঁদের সম্পর্ক দ্রুত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়।

একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

নির্বাচন, সংসদ বর্জন, হরতাল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে দুই পক্ষের সংঘাত ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। Reuters এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পরবর্তী সময়ে তাঁদের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েক দশকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এই দ্বন্দ্ব একদিকে প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি তৈরি করেছে, অন্যদিকে দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণও গভীর করেছে।

১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক সংকট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার

খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের শেষ দিকে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয় নির্বাচনকালীন সরকারের প্রশ্নে।

আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো দাবি করে, ক্ষমতাসীন দলের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয় এবং জাতীয় নির্বাচন একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে হবে।

১৯৯৪ সাল থেকে বিরোধী দলগুলোর সংসদ বর্জন, গণপদত্যাগ এবং আন্দোলনের ফলে সংকট আরও বাড়ে।

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিরোধীদের বর্জনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিএনপি জয়লাভ করে। খালেদা জিয়া আবার প্রধানমন্ত্রী হন। তবে রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকায় তাঁর সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে এবং নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি হয়।

ফলে এই পর্যায়ের প্রধানমন্ত্রীত্ব ছিল খুবই স্বল্পস্থায়ী।

১৯৯৬ থেকে ২০০১: বিরোধীদলীয় রাজনীতি

১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন।

খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন।

এই সময় বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলন, নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠনে মনোযোগ দেয়।

দুই প্রধান দলের পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও বাড়তে থাকে এবং বাংলাদেশের রাজনীতি ক্রমশ দ্বিদলীয় মেরুকরণের দিকে চলে যায়।

২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন

২০০১ সালের ১ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বড় বিজয় অর্জন করে।

Banglapedia অনুযায়ী, বিএনপি এককভাবে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৯৩টি আসন পায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করে এবং ১০ অক্টোবর ২০০১ খালেদা জিয়া আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সময় তাঁর দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ সরকার পরিচালনার অধ্যায়।

এই সরকার অর্থনীতি, বেসরকারি খাত এবং অবকাঠামোর বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেয়। তবে একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতির অভিযোগ, জঙ্গিবাদের উত্থান এবং বিরোধীদের ওপর চাপের অভিযোগও সরকারের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলে। Reuters-এর পরবর্তী মূল্যায়নেও তাঁর সরকারের অর্জনের পাশাপাশি এসব বিতর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০১–২০০৬: সাফল্য ও বিতর্ক পাশাপাশি

খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় পূর্ণ মেয়াদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত আলোচিত।

সমর্থকেরা এই সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং বিভিন্ন সামাজিক সূচকের অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন।

অন্যদিকে সমালোচকেরা দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, উগ্রপন্থী সংগঠনের উত্থান এবং প্রশাসনের রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনাও এই সরকারের সময় ঘটে। হামলায় ২৪ জন নিহত এবং কয়েকশ মানুষ আহত হন। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় বহু ব্যক্তির বিচার ও সাজা হয়; আবার ২০২৪ সালে হাইকোর্ট তারেক রহমানসহ ৪৯ জনকে ওই মামলায় খালাস দেয়।

খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মূল্যায়ন করতে গেলে তাই তাঁর সরকারগুলোর উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিবেশ—দুটি বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

২০০৬ সালের সংকট ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার

২০০৬ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়।

বিরোধী দলগুলো নির্বাচন প্রস্তুতি ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আন্দোলন, সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে ২০০৭ সালের জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল হয় এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।

ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। Human Rights Watch-এর তথ্য অনুযায়ী, এই সরকার তথাকথিত “মাইনাস টু” প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয়কেই আটক করে এবং দুর্নীতির মামলা দায়ের করে।

এই সময় আবারও তাঁর রাজনৈতিক জীবনে কারাবাসের অধ্যায় শুরু হয়।

২০০৮-এর পর দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট বড় বিজয় অর্জন করে এবং বিএনপি বিরোধী দলে চলে যায়।

এরপর দীর্ঘ সময় খালেদা জিয়া আর ক্ষমতায় ফিরতে পারেননি।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বিএনপি ও তার মিত্ররা বর্জন করে। ফলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে। Reuters-এর ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল এবং তখন থেকেই দলটি রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ে।

এই সময় খালেদা জিয়া প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।

২০১৮ সালের দুর্নীতি মামলা ও কারাবাস

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে একটি আদালত পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

মামলায় বিদেশি অনুদানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছিল। বিএনপি ও খালেদা জিয়া অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেন, তাঁকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই মামলা করা হয়েছে।

পরে আরেকটি ট্রাস্টসংক্রান্ত মামলায়ও সাত বছরের সাজা দেওয়া হয়।

এই সাজাগুলোর কারণে তিনি ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি।

তাঁর কারাবাস বিএনপির রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে এবং তারেক রহমান লন্ডন থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

অসুস্থতা ও ২০২০ সালের শর্তসাপেক্ষ মুক্তি

কারাগারে থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

২০২০ সালের মার্চে সরকার মানবিক বিবেচনায় তাঁর সাজা সাময়িক স্থগিত করে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়। শর্ত ছিল তিনি বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশে যেতে পারবেন না। পরবর্তী সময়ে এই মুক্তির মেয়াদ কয়েকবার বাড়ানো হয়।

তিনি গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’-য় অবস্থান করেন এবং গুরুতর অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণ ক্রমশ কমে যায়।

তাঁর লিভার সিরোসিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনি সমস্যা, ডায়াবেটিসসহ একাধিক শারীরিক জটিলতার কথা চিকিৎসক ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও খালেদা জিয়ার মুক্তি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন ঘটে।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দেশত্যাগ করেন। পরদিন রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন এবং খালেদা জিয়াকে তাঁর ওপর থাকা বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। Reuters ৬ আগস্টের প্রতিবেদনে তাঁকে মুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক পরিস্থিতিতেও বড় পরিবর্তন আসে।

খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের জন্য এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বহু বছর পর তাঁর দল আবার মুক্ত রাজনৈতিক পরিসরে বড় শক্তি হিসেবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়।

মামলা থেকে খালাস

২০২৪ ও ২০২৫ সালে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতির মামলাগুলোতে আদালত থেকে বড় পরিবর্তন আসে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি দুর্নীতি মামলায় তিনি খালাস পান। এরপর ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ অন্যদের খালাস দেয় এবং ২০১৮ সালের সাজা বাতিল করে।

ফলে তাঁর বিরুদ্ধে সেই মামলার দণ্ড আর বহাল থাকেনি।

এই সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্যায়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ বহু বছর ধরে ওই মামলাগুলো তাঁর রাজনীতি ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল।

চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাত্রা

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গুরুতর শারীরিক সমস্যার চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়া লন্ডনে যান।

কাতারের আমিরের ব্যবস্থাপনায় একটি বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাঁকে ঢাকা থেকে লন্ডনে নেওয়া হয়। সে সময় তাঁর লিভার সিরোসিস, হৃদ্‌রোগ ও কিডনিসহ একাধিক জটিলতা ছিল।

প্রায় চার মাস চিকিৎসার পর ৬ মে ২০২৫ তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন

বয়স ও অসুস্থতার কারণে তখন আর তিনি আগের মতো সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারছিলেন না। তবে বিএনপির প্রতীকী ও সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে তাঁর গুরুত্ব বহাল ছিল।

জীবনের শেষ সময় ও মৃত্যু

২০২৫ সালের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার আবার অবনতি ঘটে।

তিনি ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। Reuters তাঁর বয়স ৮০ বলে উল্লেখ করেছে; তবে আগেই বলা হয়েছে, তাঁর জন্মসাল নিয়ে বিভিন্ন উৎসে পার্থক্য রয়েছে।

তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশে ব্যাপক শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে এবং তাঁর জানাজার দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

৩১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় অনুষ্ঠিত জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাজধানীর জিয়া উদ্যানে স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

চার দশকের বেশি সময় বিএনপির নেতৃত্ব

খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিচয়গুলোর একটি ছিল বিএনপির দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব।

১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন হওয়ার পর তিনি চার দশকের বেশি সময় দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন করেছে, একাধিক জাতীয় নির্বাচন জিতেছে, সরকার গঠন করেছে এবং দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও রাজনীতি করেছে।

তাঁর রাজনৈতিক সংগঠনের বড় শক্তি ছিল দলের তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে তাঁর প্রতীকী সম্পর্ক। সমর্থকদের কাছে তিনি দীর্ঘদিন “আপসহীন নেত্রী” হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তবে তাঁর নেতৃত্বের সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকেরা বিএনপির পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সংঘাত, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট এবং তাঁর সরকারের সময়কার বিভিন্ন বিতর্কের কথা তুলে ধরেন।

নারী নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার গুরুত্ব

বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের ইতিহাসেও খালেদা জিয়ার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি এমন সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন, যখন সমাজে নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

একজন নারী দেশের সরকারপ্রধান, বিরোধীদলীয় নেতা এবং দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলগুলোর একটির প্রধান হিসেবে দশকের পর দশক কাজ করেছেন—এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসেও উল্লেখযোগ্য।

তবে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার দীর্ঘ নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হলেও তৃণমূল ও মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ একই গতিতে বৃদ্ধি পায়নি—এটিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।

শেখ হাসিনা বনাম খালেদা জিয়া: বাংলাদেশের এক যুগের রাজনীতি

১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতির বড় অংশ শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে।

দুজনই রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। একজন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, অন্যজন বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁরা একই বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ হলেও পরে একে অপরের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন।

Reuters তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বাংলাদেশের কয়েক দশকের রাজনৈতিক দৃশ্যপট নির্ধারণকারী সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা তৈরি করলেও একই সঙ্গে হরতাল, নির্বাচন বর্জন, সংসদ বর্জন, প্রতিশোধের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন।

তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার একমাত্রিক নয়।

সমর্থকদের কাছে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আপসহীন নেতা, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান ব্যক্তি, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির ঐক্যের প্রতীক।

তাঁর প্রথম সরকারের সময় সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং মেয়েদের শিক্ষাসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ তাঁর রাজনৈতিক অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁর সরকারের সময় রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক দলীয়করণ, ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট এবং বাংলাদেশের সংঘাতমুখী দ্বিদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশের জন্য তাঁর নেতৃত্বকেও সমালোচনা করেন।

তাই খালেদা জিয়াকে বুঝতে হলে তাঁকে শুধু সমর্থক বা বিরোধীদের ভাষায় মূল্যায়ন করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

মৃত্যুর পর বিএনপির নতুন অধ্যায়

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে।

তাঁর ছেলে এবং বিএনপির নেতা তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছরের বিদেশজীবন শেষে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বড় বিজয় অর্জন করে।

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

এর মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নতুন প্রজন্মের দিকে এগিয়ে যায়।

এ কারণে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন শুধু ইতিহাসের বিষয় নয়; বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে।

কেন বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী গুরুত্বপূর্ণ?

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী পড়লে শুধু একজন নারীর ক্ষমতায় ওঠার গল্প জানা যায় না।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গত চার দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় অংশ বোঝা যায়।

সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্ম, বিএনপি-আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকট, ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত সরকার, ২০১৮ সালের কারাবাস, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ২০২৬ সালে বিএনপির পুনরায় ক্ষমতায় আসা—সবগুলোর সঙ্গেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে খালেদা জিয়ার নাম জড়িয়ে আছে।

এই কারণেই তাঁর জীবন বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাস বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা।

উপসংহার

বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শুরু রাজনীতিতে হয়নি। তিনি প্রথমে ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তার স্ত্রী, পরে রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী এবং দেশের ফার্স্ট লেডি।

স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

একজন রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ গৃহবধূ থেকে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন করেন। কারাবরণ করেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর সরকারের সময় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

আবার তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে কঠোর দলীয় সংঘাত, নির্বাচন নিয়ে সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং নানা বিতর্কও জড়িয়ে রয়েছে।

২০১৮ সালে কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। অসুস্থতা তাঁকে জনসম্মুখ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্নীতির মামলাগুলো থেকেও খালাস পান।

অবশেষে ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমানের পাশে সমাহিত করা হয়।

কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। ২০২৬ সালে তাঁর ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আবার সরকার গঠন করে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ফলে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতেও বহমান।

ইতিহাস হয়তো তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তকে একইভাবে মূল্যায়ন করবে না। তাঁর সমর্থক ও সমালোচকদের মূল্যায়নও ভিন্ন থাকবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—

বেগম খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের গত চার দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়।

একজন গৃহবধূ থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘদিনের বিরোধীদলীয় নেত্রী, কারাবন্দী রাজনীতিক এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হওয়ার তাঁর যাত্রা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন