• সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রেম, অভিমান আর ‘আকাশের ঠিকানায় চিঠি’: রুদ্র–তসলিমার অজানা গল্প

প্রেম, অভিমান আর ‘আকাশের ঠিকানায় চিঠি’: রুদ্র–তসলিমার অজানা গল্প

আকরাম হোসেন: স্টাফ রিপোর্টার
আকরাম হোসেন: স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ০১:৫৭ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ও তসলিমা নাসরিনের সম্পর্ককে শুধু একটি ব্যর্থ প্রেম বা ভেঙে যাওয়া বিয়ে বলে ব্যাখ্যা করলে গল্পটির বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। তাদের পরিচয়ের মাধ্যমই ছিল সাহিত্য। প্রেম চলেছে চিঠিতে, সামাজিক রীতির বাইরে গিয়ে বিয়ে করেছেন, সংসারে এসে দুজনের জীবনদর্শনের সংঘর্ষ হয়েছে, বিচ্ছেদের পর কবিতায় এসেছে তীব্র বিদ্রূপ ও অভিমান—আবার মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে তাদের মধ্যে যোগাযোগও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল না।

এই কারণেই রুদ্র–তসলিমার সম্পর্ক বাংলা সাহিত্যের আলোচিত ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর একটি।

তসলিমা নাসরিন: শৈশব থেকে চিকিৎসক ও লেখক

তসলিমা নাসরিন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬২ সালের ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহে। তাঁর বাবা রজব আলী ছিলেন চিকিৎসক। মুমিনুন্নিসা কলেজে পড়াশোনার পর তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৮৪ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ময়মনসিংহ ও ঢাকার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন।

তবে চিকিৎসাবিদ্যার পাশাপাশি খুব অল্প বয়স থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল লেখালেখিতে। নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ১৩ বছর বয়সে লেখা শুরু করেন। ১৯৭৮ সাল থেকে ‘সেঁজুতি’ নামে একটি কবিতাপত্রও সম্পাদনা করতেন। পরবর্তী সময়ে কবিতা, কলাম, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও আত্মজীবনী—সব ক্ষেত্রেই তিনি লেখেন।

তাঁর প্রথম দিকের কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা’, ‘নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে’, ‘আমার কিছু যায় আসে না’ ও ‘অতলে অন্তরীণ’। পরে ‘নির্বাচিত কলাম’, ‘নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য’ এবং ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘লজ্জা’ তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি দেয়। ১৯৯৪ সালে হুমকি ও রাজনৈতিক-সামাজিক চাপের মধ্যে তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়। এরপর তাঁর জীবনের বড় অংশই নির্বাসনে কেটেছে।

তসলিমার দীর্ঘ আত্মজীবনী সিরিজের মধ্যে ‘আমার মেয়েবেলা’, ‘উতল হাওয়া’, ‘দ্বিখণ্ডিত’, ‘সেই সব অন্ধকার’, ‘আমি ভালো নেই, তুমি ভালো থেকো প্রিয় দেশ’ ও ‘নির্বাসন’ উল্লেখযোগ্য। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও রুদ্রের সঙ্গে সম্পর্কের নানা দিকও এসব লেখায় এসেছে।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ: মোংলা থেকে বাংলা কবিতার বিদ্রোহী কণ্ঠ

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশালের রেডক্রস হাসপাতালে। তাঁর পারিবারিক বাড়ি ছিল বাগেরহাটের মোংলার সাহেবের মেঠ এলাকায়। বাবা শেখ ওয়ালীউল্লাহও ছিলেন চিকিৎসক। শৈশবের বড় একটি সময় রুদ্র কাটিয়েছেন মিঠেখালিতে নানাবাড়িতে। সেখানেই বইপড়া ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।

ছোটবেলাতেই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের লেখা পড়তেন। পরে মোংলার সেন্ট পলস স্কুল এবং ঢাকার ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলে পড়েন। ১৯৭৩ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করলেও বাবার চিকিৎসক হওয়ার প্রত্যাশার বিপরীতে তিনি ঢাকা কলেজে মানবিক বিভাগ বেছে নেন।

১৯৭৫ সালে উচ্চমাধ্যমিকের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৮০ সালে বিএ অনার্স এবং ১৯৮৩ সালে এমএ সম্পন্ন করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই কবি হিসেবে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

রুদ্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উপদ্রুত উপকূল’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে। এরপর ‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’, ‘মানুষের মানচিত্র’, ‘ছোবল’, ‘গল্প’, ‘দিয়েছিলে সকল আকাশ’ ও ‘মৌলিক মুখোশ’সহ সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

তাঁর কবিতায় প্রেম যেমন ছিল, তেমনি ছিল রাষ্ট্র, সমাজ, বৈষম্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ। স্বৈরাচারবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ১৯৯১ সালের ২১ জুন তিনি মারা যান।

রুদ্র ও তসলিমার প্রথম পরিচয় কীভাবে?

এখানেই গল্পটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

তসলিমা নাসরিন ২০২৬ সালের এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে ‘সেঁজুতি’ কবিতাপত্র সম্পাদনা করতেন। রুদ্র সেই পত্রিকার জন্য কবিতা পাঠাতেন। তসলিমার বক্তব্য অনুযায়ী, এভাবেই প্রথম তিনি রুদ্রকে চিনতে শুরু করেন; এমনকি রুদ্রের পাঠানো কবিতার বানান সংশোধন করে তিনি ছাপতেন বলেও জানিয়েছেন।

বাংলা একাডেমি প্রকাশিত তপন বাগচীর রুদ্র-জীবনীতে আরও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কবি আলমগীর রেজা চৌধুরীর মাধ্যমেও দুজনের যোগাযোগ তৈরি হয়। তসলিমা তখন মেডিকেলের শিক্ষার্থী এবং ‘সেঁজুতি’ সম্পাদনা করছেন, অন্যদিকে রুদ্র ঢাকার সাহিত্যজগতে পরিচিত হয়ে উঠছেন।

সেই সাহিত্যিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত চিঠিতে রূপ নেয়।

তাদের প্রেমের একটি বড় অংশই ছিল দূরত্বের প্রেম—রুদ্র ঢাকায়, তসলিমা ময়মনসিংহে। রুদ্র নিজেই ১৯৯০ সালের একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কয়েক মাস পরপর তাদের দেখা হতো এবং চিঠিই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।

এই তথ্যটি পরে ‘আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ পঙ্‌ক্তিটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

পরিবারকে না জানিয়েই বিয়ে

বাংলা একাডেমির রুদ্র-জীবনী এবং দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ২৯ জানুয়ারি রুদ্র ও তসলিমা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়েতে পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না এবং উভয় পরিবারের আপত্তির কথাও বিভিন্ন স্মৃতিচারণে এসেছে। কিছু পরবর্তী সূত্র অবশ্য ১৯৮২ সাল উল্লেখ করে; তাই সাল নিয়ে সামান্য মতভেদ রয়েছে।

বিয়ের সময় দুজনই তখনও ছাত্রজীবনে।

বাংলা একাডেমির জীবনী অনুযায়ী, আইনি বিয়ের পরও সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সংসার শুরু হয়নি। তসলিমা মেডিকেলের পড়াশোনা শেষ করার পর তারা ঢাকায় একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন।

রুদ্রের একটি পারিবারিক চিঠিতেও দেখা যায়, তিনি প্রথাগত সামাজিক রীতি না মেনে নিজের পছন্দে বিয়ে করার সিদ্ধান্তকে তাঁর বৃহত্তর জীবনদর্শনের অংশ হিসেবে দেখতেন।

অর্থাৎ শুরু থেকেই তাদের প্রেমের মধ্যে এক ধরনের বিদ্রোহ ছিল।

তাহলে এত গভীর প্রেমের বিয়ে কেন ভেঙে গেল?

এখানে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে রুদ্র ও তসলিমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এক ছিল না। তাই এক পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য বলা ঠিক হবে না।

রুদ্র ১৯৯০ সালের একটি সাক্ষাৎকারে বিচ্ছেদের প্রধান কারণ হিসেবে বলেছিলেন—“অ্যাডজাস্টমেন্ট” বা মানিয়ে নিতে না পারা। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রেমের সময়ে দুজন দূরে থাকায় দৈনন্দিন জীবনে একে অপরকে যথেষ্ট কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়নি। একসঙ্গে বসবাস শুরু করার পর জীবনযাপন ও সম্পর্ক সম্পর্কে দুজনের ধারণার পার্থক্য প্রকাশ পায়।

রুদ্র নিজেকে প্রচলিত সামাজিক নিয়মের বিরোধী ও অনেকটা উড়নচণ্ডী প্রকৃতির মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, তসলিমাও প্রচলিত দাম্পত্য কাঠামোর বাইরে জীবন গ্রহণ করতে পারবেন; বাস্তবে তা হয়নি—এটি ছিল রুদ্রের নিজের ব্যাখ্যা।

অন্যদিকে তসলিমার পরবর্তী লেখায় রুদ্রের অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁর ঈর্ষা, কষ্ট ও অভিমানের স্মৃতি এসেছে। ফলে শুধু “তসলিমা সংসারী হতে চেয়েছিলেন, রুদ্র স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন”—এত সরল সমীকরণে বিচ্ছেদটিকে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়।

বরং বলা যায়, ব্যক্তিত্ব, জীবনযাপন, বিশ্বস্ততার প্রত্যাশা, দাম্পত্যের ধারণা এবং স্বাধীনতার সংজ্ঞা—সব মিলিয়েই সম্পর্কটি ক্রমে সংঘাতপূর্ণ হয়েছিল।

১৯৮৬ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে বলে বাংলা একাডেমির জীবনী ও দ্য ডেইলি স্টারসহ একাধিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

প্রেম থেকে অভিমান, তারপর কবিতার যুদ্ধ

রুদ্র–তসলিমার বিচ্ছেদের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো তাঁদের লেখায় একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া।

এর কেন্দ্রবিন্দুতে দুটি কবিতা—

তসলিমা নাসরিনের ‘দুধরাজ’
এবং
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘সামঞ্জস্য’।

বাংলা ট্রিবিউনসহ বিভিন্ন সাহিত্যসূত্র এই দুটি কবিতাকে বিচ্ছেদের পর লেখা পাল্টাপাল্টি কবিতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

‘দুধরাজ’: কবিকে পোষ মানাতে না পারার ক্ষোভ

তসলিমার ‘দুধরাজ’ কবিতার শুরুতেই একজন কবিকে পোষা প্রাণীর রূপকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কবিতাটির ভাষা মূলত প্রেমভঙ্গ, রাগ, বিশ্বাসভঙ্গ ও ব্যঙ্গের।

কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আছে।

তসলিমা নিজের আত্মজীবনীমূলক লেখায় উল্লেখ করেছেন যে তাঁর পরিচিত মহলে ‘দুধরাজ’ কবিতার কবিটি রুদ্র—এমন আলোচনা ছিল। তবে তিনি নিজে সরাসরি নিশ্চিত না করে বলেছেন, কবিতাটি কাকে উদ্দেশ্য করে লেখা—এর চেয়ে কবিতা হিসেবে সেটি কী হয়ে উঠেছে, সেটিই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই “দুধরাজ নিশ্চিতভাবেই রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে লেখা”—এর বদলে বলা বেশি নির্ভুল যে কবিতাটি ব্যাপকভাবে রুদ্রকে উদ্দেশ্য করা লেখা হিসেবেই পাঠ করা হয়েছে।

রুদ্রের ‘সামঞ্জস্য’: বিদ্রূপের পাল্টা বিদ্রূপ

রুদ্রের ‘সামঞ্জস্য’ কবিতার রচনাকাল ১৪ জানুয়ারি ১৯৮৯ এবং এটি পরে ‘মৌলিক মুখোশ’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। কবিতার শুরু—

“তুমি বরং কুকুর পোষো...”

এখানে রুদ্রও পোষা প্রাণীর একই রূপক নিয়ে তীব্র বিদ্রূপ করেছেন।

এ কারণেই কবিতাদুটিকে পাশাপাশি পড়লে মনে হয় যেন একজনের অভিযোগের ভাষাকেই অন্যজন অস্ত্র হিসেবে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

‘দুধরাজ’-এ যদি থাকে “আমি তোমাকে ভালোবেসে আগলে রেখেছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে আঘাত করেছ”—তাহলে ‘সামঞ্জস্য’-এ পাল্টা বক্তব্য অনেকটা “তুমি আসলে এমন কাউকে চাও, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।”

এই দ্বন্দ্ব শুধু দুই কবির ভাষার লড়াই ছিল না; তাদের দাম্পত্যের মূল সমস্যাটিও যেন এখানে প্রতীকীভাবে উঠে আসে—স্বাধীনতা বনাম অধিকারবোধ।

কিন্তু সত্যিই কি বিচ্ছেদের পর শুধু ঘৃণাই ছিল?

এখানেই রুদ্র–তসলিমার গল্পটি আরও জটিল।

না—নির্ভরযোগ্য স্মৃতিচারণগুলো দেখলে শুধু ঘৃণার গল্প পাওয়া যায় না।

বাংলা একাডেমির রুদ্র-জীবনীতে বলা হয়েছে, বিচ্ছেদের পর একসময় দুজনের মধ্যে আবার যোগাযোগ ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন সাহিত্যিক আড্ডায় তাদের দেখা হতো। রুদ্র অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে তসলিমাও তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন।

আনিসুল হকের একটি স্মৃতিচারণেও আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা পাওয়া যায়। ১৯৯১ সালে রুদ্র ময়মনসিংহে গিয়ে ব্রহ্মপুত্রের পাশে বসে অতীতের স্মৃতি স্মরণ করে বলেছিলেন, এই এলাকায় তিনি ও তসলিমা একসঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছেন।

অর্থাৎ বিচ্ছেদের পাঁচ বছর পরও সেই স্মৃতি রুদ্রের মধ্যে ছিল।

এখানে “হিংসা” শব্দটির চেয়ে “অভিমান, ক্ষোভ, ঈর্ষা, আঘাত এবং অসমাপ্ত টান”—এই চারটি শব্দ সম্ভবত সম্পর্কটিকে বেশি ভালোভাবে বোঝায়।

এবার ‘ভালো আছি ভালো থেকো’

রুদ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় গীতিকবিতার প্রকৃত শিরোনাম ‘আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে’। এরই একটি অংশ—

“ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।”

রুদ্রের সংরক্ষিত রচনাপাঠে কবিতাটির শেষে তারিখ ও স্থান পাওয়া যায়—২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩৯৬, মিঠেখালি, মোংলা। সুরও করেছিলেন রুদ্র নিজেই।

অর্থাৎ গানটি তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের কয়েক বছর পর লেখা।

পরে গানটি এত জনপ্রিয় হয় যে মূল শিরোনামের বদলে অনেক মানুষ একে ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ নামেই চেনে। গানটির জন্য রুদ্র মরণোত্তর গীতিকার হিসেবে স্বীকৃতিও পান।

গানটির মধ্যে কী আছে?

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়।

গানটির বক্তা প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে ফেলেননি স্মৃতি থেকে। বরং শারীরিক দূরত্ব সত্ত্বেও সেই মানুষ তাঁর “ভিতর”, “বাহির” ও “অন্তরে” অবস্থান করছে।

অর্থাৎ বিচ্ছেদ হয়েছে বাস্তবে, কিন্তু আবেগ থেকে বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ হয়নি।

“ভালো আছি”—এখানে একটি আত্মরক্ষামূলক উচ্চারণও পড়া যায়। যেন বলা হচ্ছে, “আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না।”

এর ঠিক পরেই—

“ভালো থেকো।”

এখানে আর রাগ নেই। বরং দূরে থাকা মানুষটির জন্য মঙ্গলকামনা।

আর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক—

“আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।”

যে দুজনের প্রেমের বড় অংশই একসময় চিঠিতে চলেছিল, তাদের গল্পের সঙ্গে এই পঙ্‌ক্তির একটি আশ্চর্য মিল আছে।

গানটি কি তসলিমা নাসরিনকে উদ্দেশ্য করেই লেখা?

এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে।

অনেক সংবাদ ও স্মৃতিচারণমূলক লেখায় গানটিকে তসলিমার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর লেখা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গানটি সত্যিই বিচ্ছেদের পরে, মোংলায় লেখা হয়েছিল।

কিন্তু “রুদ্র নিশ্চিতভাবে তসলিমাকেই উদ্দেশ্য করে গানটি লিখেছিলেন”—এমন অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।

বরং তসলিমার নামে প্রকাশিত রুদ্রকে উদ্দেশ্য করা পরবর্তী চিঠিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি রয়েছে। সেখানে তিনি স্মরণ করেন, রুদ্র একসময় তাঁকে গানটি শুনিয়েছিলেন। তারপর তসলিমা নিজেই প্রশ্ন তোলেন—রুদ্র আসলে কার চিঠি চেয়েছিলেন? তাঁর, নাকি রুদ্রের জীবনের অন্য কোনো নারীর?

এই প্রশ্নটিই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

যদি তসলিমা নিজেই নিশ্চিত না হন, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে গানটি শুধু তাঁকেই উদ্দেশ্য করে লেখা।

তবে তসলিমার সঙ্গে রুদ্রের সম্পর্ক, তাঁদের চিঠির ইতিহাস, বিচ্ছেদের সময় এবং গানটির বিষয়বস্তু—সব মিলিয়ে তসলিমার স্মৃতি যে গানটির আবেগীয় পটভূমির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, সেটি বলা যুক্তিসঙ্গত।

রুদ্র মারা যাওয়ার পর তসলিমার ভাষা কেন বদলে গেল?

জীবিত অবস্থায় তাদের সম্পর্কের ভাষা ছিল কখনো প্রেম, কখনো ঝগড়া, কখনো বিদ্রূপ।

কিন্তু ১৯৯১ সালের ২১ জুন রুদ্রের আকস্মিক মৃত্যুর পর সেই লড়াইয়ের অর্থই বদলে যায়।

তসলিমার পরবর্তী লেখায় রুদ্র সম্পর্কে গভীর শোক ও স্মৃতিচারণ পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, বিচ্ছেদের কয়েক বছর পরও রুদ্র তাঁর ভেতরে কতটা গভীরভাবে রয়ে গিয়েছিলেন, রুদ্রের মৃত্যুর পর সেটি নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন।

বাংলা একাডেমির রুদ্র-জীবনীতেও মৃত্যুর আগে তাদের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসার কথা রয়েছে।

এখানেই ‘আকাশের ঠিকানায় চিঠি’ নতুন অর্থ পায়।

জীবিত রুদ্র যে আকাশের ঠিকানায় চিঠি চাইতে লিখেছিলেন, মৃত্যুর পরে সেই রুদ্রই যেন সত্যিকার অর্থে “আকাশের ঠিকানার মানুষ” হয়ে গেলেন।

দুই কবির গল্পটাকে কীভাবে বুঝব?

রুদ্র–তসলিমার সম্পর্ককে “তারা খুব ভালোবাসত, পরে ঘৃণা করত”—এই এক লাইনে ধরলে ভুল হবে।

বরং ঘটনাপ্রবাহটা ছিল অনেকটা এমন:

প্রথমে সাহিত্য → পরিচয় → চিঠি → প্রেম → সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে বিয়ে → দূরত্ব শেষে সংসার → জীবনযাপনের সংঘর্ষ → ঈর্ষা ও অভিযোগ → বিবাহবিচ্ছেদ → কবিতায় পাল্টাপাল্টি আঘাত → ধীরে ধীরে আবার যোগাযোগ → অসমাপ্ত আবেগ → রুদ্রের মৃত্যু → স্মৃতিতে ফিরে আসা প্রেম।

এই সম্পর্কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এটিই—একজন আরেকজনকে আঘাত করেছেন, লেখায় বিদ্রূপ করেছেন, আলাদা হয়ে গেছেন; কিন্তু অন্যজনকে সম্পূর্ণভাবে নিজের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে পারেননি।

তসলিমা ২০২৬ সালেও নিজের প্রাথমিক কবিতায় রুদ্রের কিছু প্রভাব থাকার কথা স্বীকার করেছেন, যদিও পরবর্তী সাহিত্যিক পরিচয়কে তিনি নিজের স্বাধীন বিকাশ হিসেবে দেখেন।

আর রুদ্রের জীবনের শেষ বছরেও ময়মনসিংহের নদীর ধারে বসে তসলিমার সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা তাঁর মনে পড়েছিল।

এই দুই তথ্য পাশাপাশি রাখলে ‘ভালো আছি ভালো থেকো’কে শুধু একটি বিচ্ছেদের গান মনে হয় না।

এটি এমন এক আবেগের গান হিসেবে পড়া যায় যেখানে মানুষটি চলে গেছে, সম্পর্কটি নেই, ক্ষতও শুকায়নি—তবু প্রিয় মানুষটির জন্য শেষ কথাটি ঘৃণা নয়:

“ভালো থেকো।”

আর সে কারণেই সম্ভবত কয়েক দশক পরও গানটি এত মানুষের ব্যক্তিগত বিচ্ছেদের ভাষা হয়ে আছে।

বিজ্ঞাপন