শুক্রবার , ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১০ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রকাশিত: ০৬:৪২ ৩০ অক্টোবর ২০২৫
আজ ৩০ অক্টোবর—বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন ফুটবলের রাজপুত্র, ডিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আইরেসের দরিদ্র পল্লী ভিয়া ফায়োরিতায় জন্ম নেওয়া সেই ছোট্ট ছেলেটি পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিলেন এক কিংবদন্তি, যার নাম আজও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। তাঁর ৬৫তম জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা স্মরণ করছে সেই জাদুকরকে, যিনি ফুটবলকে শুধুমাত্র খেলা নয়, বরং এক শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন।
ম্যারাডোনা ছিলেন ফুটবলের ইতিহাসে এক দ্বৈত সত্তা—একদিকে ঈশ্বরের আশীর্বাদপ্রাপ্ত এক প্রতিভা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। যখনই তাঁর বাম পায়ে বল ছুঁয়েছে, তখনই যেন থেমে গেছে সময়। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়রা পরিণত হয়েছে তাঁর প্রতিভার সামনে কেবল বাধা হয়ে দাঁড়ানো কিছু ছায়ায়। দারিদ্র্যের কাদা ভেদ করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—ফুটবলের মুকুট পাওয়া যায় প্রতিভা ও অধ্যবসায়ের শক্তিতে, সামাজিক সীমারেখার তোয়াক্কা না করেও।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ:
ফুটবলের ইতিহাসে ম্যারাডোনার নাম সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠে আসে এই বিশ্বকাপে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের দুটি গোল ছিল যেন তাঁর জীবনের প্রতীক। প্রথম গোলটি—“হ্যান্ড অফ গড”—যা হয়ে উঠেছিল এক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রতিশোধের প্রতিচ্ছবি। আর দ্বিতীয় গোলটি—যা ইতিহাসে “গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি” নামে অমর—মাঝমাঠ থেকে একক প্রচেষ্টায় ছয়জন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে গোল করা, যা আজও ফুটবলের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত।
সেদিন শুধু আর্জেন্টিনা জয় পায়নি, জয় পেয়েছিল একটি জাতির আত্মা, যারা ম্যারাডোনার পায়ে খুঁজে পেয়েছিল নিজস্ব গর্ব ও স্বাধীনতার প্রকাশ।
নাপোলির নায়ক:
আর্জেন্টিনার সীমানা ছাড়িয়ে ম্যারাডোনার দ্বিতীয় জন্ম হয় ইতালিতে, নাপোলি ক্লাবে যোগ দিয়ে। ধনী উত্তরাঞ্চলীয় ক্লাবগুলোর আধিপত্য ভেঙে তিনি নাপোলিকে এনে দেন সিরি-আ শিরোপা। তখন তিনি হয়ে ওঠেন দক্ষিণ ইতালির দরিদ্র মানুষের কণ্ঠস্বর—একজন সাধারণের দেবতা। নেপলসের রাস্তায় আজও তাঁর ছবিতে মানুষ প্রার্থনা করে, তাঁর নাম উচ্চারণ করে শ্রদ্ধা জানায়।
বিতর্ক ও ট্র্যাজেডি:
তবে ম্যারাডোনার জীবন শুধু গৌরবেই ভরা ছিল না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন মাদকাসক্তি, অসুস্থতা ও আত্মসংঘর্ষে। তিনি যেন নিজের প্রতিভারই শিকার হয়েছিলেন—যিনি মাঠে ছিলেন ঈশ্বর, কিন্তু জীবনের বাইরে ছিলেন এক দুর্বল মানুষ।
শেষ অধ্যায়:
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর, মাত্র ৬০ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ব ফুটবল যেন থমকে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর তৈরি করা স্মৃতি, তাঁর বাঁ পায়ের জাদু, তাঁর বিদ্রোহী মন—সব আজও জীবন্ত ফুটবলের প্রতিটি হৃদয়ে।
ডিয়েগো ম্যারাডোনা প্রমাণ করেছিলেন—ফুটবল কেবল এক খেলা নয়, এটি একটি অনুভূতি, একটি বিপ্লব, একটি শিল্প। তাঁর জীবন যেমন ছিল গৌরব ও ব্যর্থতার সংমিশ্রণ, তেমনি তাঁর নামও আজ চিরকাল অমর—ফুটবলের রাজপুত্র, যিনি নিজের পায়ের ছোঁয়ায় পৃথিবী বদলে দিয়েছিলেন।
