শুক্রবার , ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১০ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রকাশিত: ০৫:২৮ ৬ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন আজ সোমবার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শুরু হয়েছে। সকাল থেকেই ভোটগ্রহণ চলছে, যা বিকেল চারটা পর্যন্ত চলবে। ইতোমধ্যে ভোট দিয়েছেন বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর ও পরিচালক প্রার্থী।
নির্বাচনের এই ধাপে বিএনপিপন্থী প্রার্থীরা সরে দাঁড়ানোয় ভোটে কোনো উত্তেজনা নেই। জেলা ও বিভাগ ক্যাটাগরি থেকে ১০ পরিচালকের মধ্যে ৮ জনই কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ক্লাব ক্যাটাগরি থেকেও কারা বোর্ডে আসবেন, তা ভোটের আগেই প্রায় নিশ্চিত।
শুধু ক্যাটাগরি–৩–এর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ ও কোয়াবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পালের মধ্যে। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে খালেদ মাসুদের অবস্থান শক্ত হওয়ায় তাঁর জয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
আজ সন্ধ্যায় পরিচালনা পরিষদের নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই বোর্ডের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হবেন বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলাম—এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে বিসিবির এই একতরফা নির্বাচনের মাঝেই একমাত্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সহসভাপতির দ্বিতীয় পদ নিয়ে।
দুই সহসভাপতির একজন হিসেবে নাজমূল আবেদীন ইতোমধ্যে প্রায় নিশ্চিত। তিনি বর্তমান বোর্ডেও সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন এবং এবারও জেলা ক্যাটাগরি থেকে প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু নাজমূলের পাশাপাশি দ্বিতীয় সহসভাপতি কে হবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, এই একটি বিষয় নিয়েই এখন গভীর সংকটে পড়েছেন বিসিবির নীতিনির্ধারকেরা। কারণ এবারের পুরো নির্বাচনই তাদের ছকে সাজানো হলেও সহসভাপতির পদে এমন কাউকে চাচ্ছেন তাঁরা, যিনি খেলার মানুষ এবং বিতর্কমুক্ত। কিন্তু যাঁর নামই উঠে আসছে, তাঁর সঙ্গে কোনো না কোনো বিতর্ক বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে।
গতকাল উচ্চপর্যায়ের এক আলোচনায় বিসিবির সাবেক তিন পরিচালকসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে দ্বিতীয় সহসভাপতির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে। কিন্তু তাঁদের সবাইকে মনে করা হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ অথবা সুবিধাভোগী। ফলে তাঁদের নাম নিয়ে দ্বিধায় আছেন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা।
এমনকি একসময় সহসভাপতির পদে যাঁর নাম শোনা গিয়েছিল, তিনি এখন নির্বাচনে নেই। ওই ব্যক্তির শর্ত ছিল তাঁকে একটি বিশেষ কমিটির প্রধান করতে হবে, যা নীতিনির্ধারকেরা গ্রহণযোগ্য মনে করেননি।
বর্তমানে সভাপতি আমিনুল ইসলাম ও সহসভাপতি নাজমূল দুজনই জেলা–বিভাগ ক্যাটাগরি–১ থেকে। ভারসাম্য বজায় রাখতে দ্বিতীয় সহসভাপতিকে ক্লাব ক্যাটাগরি বা ক্যাটাগরি–২ থেকে নিতে চাচ্ছেন নীতিনির্ধারকেরা। কিন্তু সেখানেও নির্ভরযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সূত্র বলছে, এমন একজনের নামও এখন আলোচনায় আছে, যিনি বিপিএলের ফিক্সিং তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লিখিত এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিসিবির সঙ্গে ব্যবসায় তিনি অন্যায্য সুবিধা পেয়েছিলেন এবং এখনো সেই সুবিধা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন।
বিসিবির অভ্যন্তরে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে যদি বিপিএল ফিক্সিংয়ের রিপোর্ট প্রকাশ হয় বা কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিসিবির শীর্ষ পর্যায়ের কারও সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসে, তাহলে দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
একজন সাবেক ক্রিকেটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যদি এমন কেউ বোর্ডে আসে, তাহলে তদন্ত রিপোর্ট হয়তো আর প্রকাশই পাবে না। বরং বিসিবির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা যদি পরিচালক বা সহসভাপতি হন, তাহলে ক্রিকেটের আর্থিক ক্ষতি হবে, নৈতিক ক্ষতির কথাই বা বাদ দিই কীভাবে?”
আরেক অভিজ্ঞ ক্রিকেট সংগঠক মনে করেন, সহসভাপতি হিসেবে সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদ বা খালেদ মাসুদের মতো কাউকে বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে ফারুক সাবেক সভাপতি হওয়ায় তাঁর পক্ষে এক ধাপ নিচে নামা ভালো দেখাবে না, আর মাসুদও ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে নন। তাই নীতিনির্ধারকেরা এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
ওই সংগঠকের ভাষায়, “অন্যসব কারণ একপাশে রাখা যায়, কিন্তু যাঁদের ওপর ফিক্সিংয়ের সন্দেহ আছে, তাঁদের দিয়ে ক্রিকেটের সুনাম রক্ষা সম্ভব নয়। সহসভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁদের আসা মানে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলা।”
বিসিবির ভেতরের সূত্রগুলোর মতে, যোগ্য ও বিতর্কমুক্ত কাউকে খুঁজে না পেলে সহসভাপতির দ্বিতীয় পদটি আপাতত শূন্য রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে। ফলে বোর্ড গঠনের আগমুহূর্তে বিসিবির ভেতরে তৈরি হয়েছে নতুন এক ‘সংকট’।
সভাপতি ও এক সহসভাপতির নাম প্রায় নিশ্চিত হলেও দ্বিতীয় সহসভাপতি নিয়ে এই অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনে নতুন এক অস্বস্তি তৈরি করেছে—যা হয়তো ভোট শেষের পরও বহাল থাকতে পারে।
