• বুধবার , ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ | ১৬ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৭ হাজার কোটি টাকায় চীন থেকে ২০ টি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ

২৭ হাজার কোটি টাকায় চীন থেকে ২০ টি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৩৬ ৮ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন ও জাতীয় আকাশ প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকার চীনের তৈরি ২০টি জে-১০ সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। ৪.৫ প্রজন্মের এই আধুনিক মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট কেনা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য খরচসহ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২২০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৭,০৬০ কোটি টাকা। চুক্তিটি সরাসরি ক্রয় বা জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) পদ্ধতিতে চীন সরকারের সঙ্গে সম্পন্ন হতে পারে এবং চলতি ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এর বাস্তবায়ন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিমানের মূল্য ১০ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০৩৫-২০৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত ধাপে ধাপে পরিশোধ করতে হবে।

জে-১০ সিই জঙ্গিবিমানটি মূলত চীনের বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত জে-১০সি মডেলের রপ্তানি সংস্করণ। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে তৈরি করা সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি বিমানের মূল্য ৬ কোটি ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অনুযায়ী ২০টি বিমানের মোট দাম দাঁড়ায় ১২০ কোটি ডলার বা প্রায় ১৪,৭৬০ কোটি টাকা। স্থানীয় ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি, পরিবহন, বীমা, ভ্যাট, কমিশন ও পূর্ত কাজসহ অতিরিক্ত খরচ যোগ করলে মোট ব্যয় দাঁড়াবে ২২০ কোটি ডলার। এই বিশাল প্রকল্পের অর্থপ্রদানের সময়সীমা হবে ১০ বছর, যাতে প্রতি অর্থবছরে ধাপে ধাপে কিস্তি পরিশোধের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

চলতি বছরের মার্চে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের সময় এই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। চীন এতে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে। এরপর গত এপ্রিলে বিমানবাহিনীর প্রধানকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি খসড়া চুক্তিপত্র পরীক্ষা করে দেখবে, জিটুজি পদ্ধতিতে কেনা কতটা উপযুক্ত হবে তা নির্ধারণ করবে, চীনা প্রতিনিধিদের সঙ্গে দরকষাকষি করে চূড়ান্ত মূল্য, পেমেন্ট টার্মস, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ সংক্রান্ত শর্তাবলী নির্ধারণ করবে।

জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান হলো চীনের অন্যতম আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের ফাইটার জেট, যা বহুমাত্রিক মিশন পরিচালনায় সক্ষম। এটি একই সঙ্গে বায়ু-আকাশ ও বায়ু-ভূমি হামলা চালাতে পারে। পাকিস্তান সম্প্রতি এই মডেলের যুদ্ধবিমান তাদের বাহিনীতে যুক্ত করেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিকভাবে মডেলটি বেশ আলোচিত হয়েছে। এমনকি ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে জে-১০ সিই ব্যবহার করে পাকিস্তান রাফায়েল ধ্বংসের দাবি করেছিল, যদিও সেটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। এই ঘটনায় জে-১০ সিই বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল এ এন এম মনিরুজ্জামান (অব.) বলেন, “বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দীর্ঘদিন ধরেই আধুনিক জঙ্গিবিমানের প্রয়োজন ছিল। এই সিদ্ধান্ত সেই প্রয়োজন মেটাবে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “বিশ্বে বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তীব্র। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক এখন টানাপোড়েনে। তাই কোনো দেশ থেকে যুদ্ধবিমান কেনার আগে এর কূটনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।”

বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মোট ২১২টি বিমান রয়েছে, যার মধ্যে ৪৪টি ফাইটার জেট। এর মধ্যে ৩৬টি চীনা নির্মিত এফ-৭ এবং বাকিগুলো রাশিয়ার তৈরি মিগ-২৯বি ও ইয়াক–১৩০ লাইট অ্যাটাক বিমান। পুরনো মডেলের এফ–৭ বিমানের পরিবর্তে জে-১০ সিই যুক্ত হলে বিএএফের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও কৌশলগত শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চীনের বাইই অ্যারোবেটিক টিম ইতোমধ্যেই তাদের প্রদর্শনী বহরে সর্বাধুনিক জে-১০সি মডেল যুক্ত করেছে। উন্নত পারফরম্যান্স, শক্তিশালী ইঞ্জিন, আধুনিক রাডার সিস্টেম ও দূরপাল্লার অস্ত্র বহনে সক্ষম হওয়ায় এটি বর্তমানে চীনের অন্যতম উন্নত যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, চীন থেকে জে-১০ সিই ফাইটার জেট কেনা বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। এটি শুধু বিমান বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে না, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভারসাম্যেও নতুন মাত্রা যোগ করবে। তবে, বিশাল এই বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে সরকারকে সাবধানে ও কৌশলগতভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
 

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/