• শুক্রবার , ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ | ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয় সংসদ ভবন তৈরির ইতিহাস

জাতীয় সংসদ ভবন তৈরির ইতিহাস

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫:৪৪ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫

স্থাপত্যশৈলী, নান্দনিকতা ও মহিমার দিক দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশকে পরিচিত করেছে যে কয়টি স্থাপনা, জাতীয় সংসদ ভবন তাদের অন্যতম। মার্কিন স্থপতি লুই ইসাডোর কানের নকশায় তৈরি এই স্থাপনা শুধু ঢাকার সৌন্দর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়নি, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

১৯৫৯ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব খান পাকিস্তানের রাজধানী করাচি থেকে ইসলামাবাদে স্থানান্তর করেন। এরপর সিদ্ধান্ত হয় পূর্ব পাকিস্তানে হবে দ্বিতীয় রাজধানী। স্থান নির্ধারণ করা হয় ঢাকার শেরেবাংলা নগরে, যার নামকরণ হয় "আইয়ুব নগর"।
এই বিশাল নগর পরিকল্পনার জন্য স্থপতি মাজহারুল ইসলাম প্রস্তাব করেন তিনজন বিশ্বখ্যাত স্থপতির নাম—ল্য করব্যুজিয়ে, আলভার আইতো ও লুই আই কান। শেষ পর্যন্ত কাজটি পান কান, যিনি নতুন একটি শহর পরিকল্পনার স্বপ্ন দেখছিলেন দীর্ঘদিন ধরে।

১৯৬২ সালে কান প্রথমবার ঢাকায় আসেন। এখানকার প্রকৃতি, আলো-ছায়া, নদী, লাল ইট ও সবুজ পরিবেশ তাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। তিনি শুধু সংসদ নয়, বরং সুপ্রিম কোর্ট, প্রেসিডেন্ট প্যালেস, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি শহরের পরিকল্পনা জমা দেন।
তবে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবন, লেক, হাসপাতাল ও আবাসিক অংশ বাস্তবায়িত হয়। কানের কল্পনায় যে পূর্ণাঙ্গ শহর ছিল, তা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।

১৯৬৪ সালে সংসদ ভবনের মূল প্ল্যান জমা দেন কান। পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অষ্টভুজাকৃতির মূল সংসদ কক্ষ। এর চারপাশে রয়েছে আটটি ব্লক—উত্তরে সিঁড়িঘর, পশ্চিমে মন্ত্রী ও আমলাদের চেম্বার, দক্ষিণে নামাজঘর এবং পূর্বে অন্যান্য অফিস।
বিশাল নামাজঘরের চার কোণায় ফাঁপা কলাম রাখা হয়, যেখান দিয়ে আলো ও বাতাস প্রবাহিত হয়। মুসলিমপ্রধান দেশের আবহে কান এমনভাবে নকশা করেন যে সংসদ সদস্যরা প্রবেশের সময় নামাজঘরের নিচ দিয়ে আসবেন, যাতে মনে পবিত্রতার অনুভূতি জাগে।

ভবনটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে কংক্রিট ও লাল ইট।

আলো-ছায়ার খেলা আনার জন্য তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন জ্যামিতিক ফাঁকা অংশ।

দক্ষিণ প্লাজা, যেখানে ঈদের জামাতও অনুষ্ঠিত হয়, আর উত্তর প্রান্তে প্রেসিডেন্টস প্লাজা ভবনটির মহিমা বাড়িয়েছে।

কানের নকশায় প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতা একসঙ্গে মিলেমিশে গেছে।

১৯৬৩ সালের ১২ মার্চ লুই কানের প্রথম মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদিত হয়। বাজেটের ৭ শতাংশ বরাদ্দ ছিল স্থপতির জন্য। বহু পরিবর্তন শেষে ১৯৭৩ সালে চূড়ান্ত রূপ পায় জাতীয় সংসদ ভবন।
তবে দুঃখজনকভাবে কানের পরিকল্পিত পূর্ণাঙ্গ শহর বাস্তবায়িত হয়নি। সংসদ ভবনকে ঘিরেই দাঁড়িয়ে গেছে একটি মহিমান্বিত স্থাপনা, যা আজও বিশ্ববাসীর চোখে বাংলাদেশের অন্যতম স্থাপত্যশৈলীর কীর্তি।

জাতীয় সংসদ ভবন শুধু আইন প্রণয়নের স্থান নয়, এটি বাংলাদেশের স্থাপত্যশৈলী, কৃষ্টির প্রতীক। লুই আই কান একে কালজয়ী স্থাপনায় রূপ দিয়েছেন, যা দেশের গর্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বিশ্বমানের স্থাপত্যের তালিকায়।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/