• মঙ্গলবার , ২৩ জুন, ২০২৬ | ৮ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইনের মৃত্যুদণ্ডের ১৯ বছর

আজ প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইনের মৃত্যুদণ্ডের ১৯ বছর

সজিব হোসেন: মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
সজিব হোসেন: মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২:১২ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায় ও ইরাক যুদ্ধের রক্তাক্ত বাস্তবতা

আজ ৩০ ডিসেম্বর। ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ১৯ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৬ সালের এই দিনে, পবিত্র ঈদুল আজহার সকালে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়—যা বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর আলোড়ন তোলে এবং মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

সাদ্দাম হুসেইন ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের এক সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়কদের একজন। ১৯৭৯ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৪ বছর তিনি ইরাক শাসন করেন। তার শাসনামল ছিল একদিকে কঠোর ও স্বৈরাচারী, অন্যদিকে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের প্রতীক।

মার্কিন আগ্রাসন ও ইরাক যুদ্ধ

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ (Weapons of Mass Destruction – WMD) মজুদের অভিযোগ তুলে ইরাকে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন দাবি করে, সাদ্দাম হুসেইনের সরকার এসব মারনাস্ত্র তৈরি করছে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। একইসঙ্গে ইরাককে সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও অভিযুক্ত করা হয়।

এই অভিযোগের ভিত্তিতেই জাতিসংঘের পূর্ণ অনুমোদন ছাড়াই ইরাকে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাগদাদ দখল করা হয় এবং সাদ্দাম হুসেইনের শাসনের অবসান ঘটে।

সাদ্দাম হুসেইনের গ্রেপ্তার ও বিচার

২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর, ইরাকের তিকরিত অঞ্চলের কাছে একটি ভূগর্ভস্থ আশ্রয়স্থল থেকে মার্কিন সেনারা সাদ্দাম হুসেইনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তাকে ইরাকের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

ডুজাইল গণহত্যা মামলায় ১৯৮২ সালে ১৪৮ জন শিয়াকে হত্যার দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০০৬ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর তা কার্যকর করা হয়।

মৃত্যুদণ্ড ও বিতর্ক

পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে একজন সাবেক মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানকে ফাঁসি দেওয়াকে অনেকেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হিসেবে দেখেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে অপমানজনক ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চিত্র, যা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচিত হয়।

গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ‘মিথ্যা অভিযোগ’

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যে অভিযোগে ইরাকে আগ্রাসন চালানো হয়েছিল, সেই গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অস্তিত্ব শেষপর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি। বহু বছর ধরে পরিচালিত অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক তদন্তকারী সংস্থাগুলো ইরাকে কোনো WMD খুঁজে পায়নি। একইভাবে, কোনো আন্তর্জাতিক তদন্তেই সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে ইরাক সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি।

পরবর্তীতে মার্কিন কর্মকর্তারাই স্বীকার করেন, ইরাক যুদ্ধের গোয়েন্দা তথ্য ছিল ভুল ও বিভ্রান্তিকর।

ইরাক যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়

ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহতায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ লক্ষাধিক মানুষ। ধ্বংস হয়ে গেছে দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। প্রায় ৭১ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে এবং পুরো দেশ দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার মধ্যে নিপতিত হয়।

সাদ্দাম হুসেইনের পতনের পর ইরাক শান্তি পায়নি; বরং সাম্প্রদায়িক সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ ও আইএসের উত্থান দেশটিকে আরও রক্তাক্ত করেছে।

ইতিহাসের বিচারে সাদ্দাম

সাদ্দাম হুসেইন একদিকে যেমন ছিলেন কঠোর শাসক, অন্যদিকে অনেকের কাছে তিনি ছিলেন পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আরব জাতীয়তাবাদের প্রতীক। তার মৃত্যুদণ্ডের ১৯ বছর পরও ইরাক যুদ্ধ ও তার বিচারপ্রক্রিয়া আজও ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

এই দিনটি তাই শুধু একজন শাসকের মৃত্যুদণ্ডের স্মৃতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির নামে চালানো আগ্রাসন, মিথ্যা অভিযোগ ও মানবিক বিপর্যয়ের এক করুণ স্মারক।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/