ভারত–পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা: চীন না পাকিস্তান—কার লক্ষ্যবস্তু?

ভারত–পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা: চীন না পাকিস্তান—কার লক্ষ্যবস্তু?

অনলাইন ডেস্ক, মোরনিউজবিডি
অনলাইন ডেস্ক, মোরনিউজবিডি

প্রকাশিত: ০১:০৮ ৩০ আগস্ট ২০২৫

দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে। ২০ আগস্ট ভারত ঘোষণা দিয়েছে, তারা সফলভাবে অগ্নি-৫ নামের মাঝারি থেকে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। উড়িষ্যা রাজ্যের বে অব বেঙ্গল উপকূল থেকে উৎক্ষেপিত এ ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের কৌশলগত সামরিক শক্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

অগ্নি-৫: ভারতের শক্তির প্রদর্শনী

সংস্কৃত শব্দ অগ্নি মানে ‘আগুন’। নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে অগ্নি–৫ যেন অগ্নিশক্তির প্রতীক।

  • দৈর্ঘ্য: ১৭.৫ মিটার
  • ওজন: ৫০ হাজার কেজি
  • বহনক্ষমতা: এক হাজার কেজির বেশি পারমাণবিক বা প্রচলিত ওয়ারহেড
  • পাল্লা: ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি
  • গতি: ঘণ্টায় প্রায় ৩০ হাজার কিলোমিটার

এমন ক্ষমতা ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে বিশ্বের দ্রুততম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সারিতে দাঁড় করিয়েছে। এই পাল্লার মধ্যে শুধু পাকিস্তান নয়, চীনের উত্তরাঞ্চল ও ইউরোপের কিছু অংশও পড়ে।

পাকিস্তানের পাল্টা প্রস্তুতি

ভারতের পরীক্ষার সপ্তাহখানেক আগে পাকিস্তান ঘোষণা দেয়, তারা নতুন আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড (এআরএফসি) গঠন করতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মে মাসে চার দিনের সীমান্ত সংঘাতে নিজেদের প্রতিরক্ষার ঘাটতি টের পাওয়ার পর ইসলামাবাদ এ উদ্যোগ নেয়।
তাদের অস্ত্রভাণ্ডারে ইতিমধ্যে রয়েছে—

  • শাহীন-৩: পাল্লা ২,৭৫০ কিমি
  • আবাবিল: দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম এমআইআরভি প্রযুক্তিসম্পন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (পল্লা ২,২০০ কিমি)
  • ফাতাহ-৪: পাল্লা ৭৫০ কিমি, প্রচলিত ও পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম

তবে পাকিস্তানের এখনো কোনো পারমাণবিক সাবমেরিন বা ৫ হাজার কিমি–এর বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নেই।

ভারতের আসল নিশানা কে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নি–৫–এর মূল উদ্দেশ্য পাকিস্তান নয়, বরং চীনকে লক্ষ্য করা।

  • ভারতের জন্য পাকিস্তান ইতিমধ্যেই ব্রহ্মসের মতো সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে নাগালে।
  • চীনের পূর্ব উপকূলীয় অর্থনৈতিক শহরগুলো ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ। সেগুলোতে আঘাত হানতে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র অপরিহার্য।
  • ২০২০ সালের লাদাখ সংঘর্ষ এবং সীমান্তে টানাপোড়েনের পর থেকে নয়াদিল্লি ক্রমেই চীনকে প্রধান হুমকি হিসেবে দেখছে।

অগ্নি থেকে অগ্নি-৬: ভারতের পরবর্তী ধাপ

অগ্নি-৫–এর পর ভারত এখন কাজ করছে অগ্নি-৬ নিয়ে, যার পাল্লা হবে ১০ হাজার কিমি–এর বেশি। এতে থাকবে একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু আঘাত করার এমআইআরভি প্রযুক্তি
বর্তমানে ভারতের হাতে রয়েছে:

  • দুটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন (এসএসবিএন), আরও দুটি নির্মাণাধীন
  • ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল (পল্লা ৫০০ কিমি)
  • অগ্নি সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র (পল্লা ৭০০ কিমি থেকে ৫ হাজার কিমি+)

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বনাম ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা

  • পাকিস্তানের কর্মসূচি মূলত ভারতকেন্দ্রিক ও প্রতিরক্ষামূলক।
  • ভারতের লক্ষ্য সীমান্ত পেরিয়ে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে অবস্থান নেওয়া।
  • পাকিস্তান চেষ্টা করছে ভারত ছাড়াও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্লায় আনার।
  • অন্যদিকে ভারত চীনকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরে নিয়ে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন করছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: ভিন্ন চোখে ভারত ও পাকিস্তান

  • যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ, এর ইতিহাসে রয়েছে পশ্চিমাবিরোধী মনোভাব।
  • অপরদিকে, ভারতের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন পশ্চিমাদের কাছে অস্থিতিশীল মনে হচ্ছে না। বরং ভারতকে তারা এশিয়ার নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখতে চাইছে।
  • ২০০৮ সালে পরমাণু সরবরাহকারী গ্রুপ (এনএসজি) ভারতের জন্য ছাড় দেয়। ফলে এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেও ভারত বৈশ্বিক পারমাণবিক বাণিজ্যে অংশ নিতে পারছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা

  • ভারত–পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই নয়, বৈশ্বিক কূটনীতিকেও প্রভাবিত করছে।
  • ভারত চায় চীনের পাল্লায় পৌঁছাতে এবং বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে।
  • পাকিস্তান চায় ভারতকে প্রতিরোধ করতে এবং একইসঙ্গে অন্য দেশগুলোকে হুমকির আওতায় আনতে।

 

দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভারতের লক্ষ্য বহুদূর, বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করা। আর পাকিস্তান প্রতিরক্ষার নামে ক্রমেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

 

বিজ্ঞাপন