• সোমবার , ১৩ জুলাই, ২০২৬ | ২৯ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রকৃতির রুদ্ররূপ ও মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই: হৃদয় ছুঁয়ে যাবে যে ৫ সিনেমা

প্রকৃতির রুদ্ররূপ ও মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই: হৃদয় ছুঁয়ে যাবে যে ৫ সিনেমা

বিনোদন প্রতিবেদক
বিনোদন প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১:৩০ ১৩ জুলাই ২০২৬

প্রযুক্তি ও আধুনিক সভ্যতায় মানুষ অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতি যখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করে, তখন মানুষের সীমাবদ্ধতা মুহূর্তেই সামনে চলে আসে। টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, বন্যা কিংবা উত্তাল সমুদ্র শুধু ঘরবাড়ি ও জীবিকা কেড়ে নেয় না; মানুষের সম্পর্ক, সাহস এবং মানবিকতারও কঠিন পরীক্ষা নেয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে নির্মিত হয়েছে বহু চলচ্চিত্র। কোনো সিনেমায় উঠে এসেছে কৃষকের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, কোথাও দুর্যোগের মধ্যে জন্ম নেওয়া ভালোবাসা, আবার কোনো গল্পে সাধারণ মানুষই হয়ে উঠেছেন একে অন্যের শেষ আশ্রয়। প্রকৃতির সামনে মানুষের অসহায়ত্ব ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি তুলে ধরা এমন পাঁচটি সিনেমা নিয়ে এই আয়োজন।

কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের মানুষ ও তাদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘কুড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’। মুহাম্মদ কাইয়ুম পরিচালিত সিনেমাটিতে ভাটি অঞ্চলের প্রকৃতি, কৃষিনির্ভর জীবন এবং সাধারণ মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ গভীরভাবে উঠে এসেছে।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুলতানের যাত্রার মধ্য দিয়ে হাওরের মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা দর্শকের সামনে আসে। প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা এসব মানুষের কাছে অতিবৃষ্টি কিংবা আকস্মিক বন্যা শুধু সাময়িক দুর্ভোগ নয়; এটি তাদের ঘর, ফসল ও ভবিষ্যৎ হারানোর আশঙ্কা।

চলচ্চিত্রটি খুব শান্ত ও বাস্তবধর্মী ভাষায় দেখায়, প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যেও কীভাবে ভয়ংকর অনিশ্চয়তা লুকিয়ে থাকে। এটি কোনো সাধারণ দুর্যোগের সিনেমা নয়; বরং মাটি, মানুষ ও জীবিকার সম্পর্ক নিয়ে নির্মিত এক আবেগঘন আখ্যান।

সাঁতাও

খন্দকার সুমন পরিচালিত ‘সাঁতাও’ উত্তরবঙ্গের কৃষক ও নারীদের জীবনঘনিষ্ঠ একটি চলচ্চিত্র। ‘সাঁতাও’ রংপুর অঞ্চলের একটি পরিচিত শব্দ, যা দীর্ঘ সময় ধরে চলা টানা বৃষ্টির বিশেষ পরিস্থিতিকে বোঝায়।

একটানা বর্ষণে কৃষকের জমি, ফসল ও স্বাভাবিক জীবন কীভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, সিনেমাটিতে তার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। একই সঙ্গে একজন প্রান্তিক নারীর ব্যক্তিগত বেদনা এবং সামাজিক লড়াই গল্পটিকে আরও মানবিক করে তুলেছে।

গণঅর্থায়নে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের বড় শক্তি এর স্বাভাবিক পরিবেশ ও স্থানীয় ভাষা। এখানে দুর্যোগকে অতিরঞ্জিত দৃশ্যের মাধ্যমে নয়, সাধারণ মানুষের খাবার, কাজ, পরিবার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে দেখানো হয়েছে। ফলে দর্শক চরিত্রগুলোর কষ্টকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন।

কেদারনাথ

ভারতের উত্তরাখণ্ডে ২০১৩ সালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পটভূমিতে নির্মিত বলিউড সিনেমা ‘কেদারনাথ’। মূল গল্পটি আবর্তিত হয়েছে স্থানীয় মালবাহক মনসুর এবং পুরোহিত পরিবারের মেয়ে মন্দাকিনীকে ঘিরে।

ভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের এই দুই তরুণ-তরুণীর সম্পর্ক নানা বাধার মুখে পড়ে। কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যেই পাহাড়ি এলাকায় নেমে আসে প্রবল বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যা। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পরিচিত জনপদ এবং শুরু হয় মানুষের প্রাণ বাঁচানোর লড়াই।

প্রেমের গল্পের সঙ্গে প্রকৃতির বিপর্যয়কে মিলিয়ে সিনেমাটি আত্মত্যাগ, মানবিকতা ও সাহসের কথা বলে। দুর্যোগের সময় পরিচয় ও বিভাজনের চেয়ে মানুষের জীবন যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, গল্পটি সেই বার্তাও সামনে আনে।

২০১৮

কেরালার ভয়াবহ ২০১৮ সালের বন্যার ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত মালয়ালম চলচ্চিত্র ‘২০১৮’। এতে কোনো একজন মানুষকে কেন্দ্র করে গল্প এগোয় না। বরং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের জীবনকে একই দুর্যোগের মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে।

একজন সাবেক সেনাসদস্য, মৎস্যজীবী, গাড়িচালক, সাংবাদিকসহ নানা চরিত্রের চোখ দিয়ে বন্যার ভয়াবহতা দেখা যায়। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক পরিচয়গুলো গুরুত্ব হারায়। তখন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে—সে আরেকজন মানুষকে বাঁচাতে পারে কি না।

বাস্তব ঘটনার আবহ, উদ্ধারকাজের দৃশ্য এবং সাধারণ মানুষের সাহস সিনেমাটিকে আবেগপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে কেরালার মৎস্যজীবীদের ভূমিকা, যারা নিজেদের নৌকা নিয়ে দুর্গত মানুষকে উদ্ধারে এগিয়ে এসেছিলেন। চলচ্চিত্রটি দেখায়, বড় বিপর্যয়ের সময় সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই অনেক সময় সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়।

দ্য পারফেক্ট স্টর্ম

উত্তাল আটলান্টিক মহাসাগরের পটভূমিতে নির্মিত হলিউড চলচ্চিত্র ‘দ্য পারফেক্ট স্টর্ম’। বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় তৈরি সিনেমাটির গল্প একটি বাণিজ্যিক মাছ ধরার নৌযান এবং এর নাবিকদের ঘিরে।

সমুদ্রে মাছ ধরার অভিযান শেষে ফেরার পথে নৌযানটি ভয়াবহ ঝড়ের মুখোমুখি হয়। তীব্র বাতাস, ভারী বৃষ্টি ও বিশাল ঢেউয়ের সামনে নাবিকদের সব অভিজ্ঞতা ও সাহস কঠিন পরীক্ষায় পড়ে।

সিনেমাটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো সমুদ্রের ভয়ংকর শক্তির বাস্তবধর্মী উপস্থাপন। মানুষের তৈরি নৌযান, প্রযুক্তি ও পরিকল্পনা প্রকৃতির বিশালতার সামনে কতটা ক্ষুদ্র—প্রতিটি দৃশ্যে তা অনুভব করা যায়। শেষ পর্যন্ত এটি শুধু সমুদ্রযাত্রার গল্প নয়; বরং দায়িত্ব, সাহস ও অনিশ্চিত জীবনের এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি।

এই পাঁচ সিনেমার পটভূমি ও ভাষা আলাদা হলেও মূল বক্তব্য প্রায় একই। প্রকৃতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন অর্থ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক পরিচয় খুব সামান্যই কাজে আসে। মানুষের পাশে দাঁড়ায় মানুষই।

কোনো গল্পে পরিবার রক্ষার চেষ্টা, কোথাও অচেনা মানুষের জন্য আত্মত্যাগ, আবার কোথাও হারিয়ে যাওয়া জীবিকা নতুন করে গড়ে তোলার সংগ্রাম দেখা যায়। এসব সিনেমা দর্শককে শুধু আবেগপ্রবণ করে না; প্রকৃতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দুর্যোগের মুখে মানুষের দায়িত্ব নিয়েও ভাবতে শেখায়।

বিজ্ঞাপন