• রবিবার , ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১৯ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মাছশূন্য সেন্ট মার্টিন: আতঙ্ক ছড়াচ্ছে জেলিফিশ সদৃশ ‘নুইন্যা’

মাছশূন্য সেন্ট মার্টিন: আতঙ্ক ছড়াচ্ছে জেলিফিশ সদৃশ ‘নুইন্যা’

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:০২ ৭ জানুয়ারী ২০২৬

কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উপকূলীয় সামুদ্রিক পরিবেশে সম্প্রতি এক উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক সময় মাছসমৃদ্ধ এই সাগরে এখন জেলেদের জালে উঠছে না প্রত্যাশিত মাছ, বরং অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে জেলিফিশ ও জেলিফিশ আকৃতির ক্ষুদ্র প্রাণী জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটন, যা স্থানীয়ভাবে ‘নুইন্যা’ নামে পরিচিত। সাধারণ মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় দ্বীপের শত শত জেলে পরিবার পড়েছে চরম দুশ্চিন্তায়।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটন নরম, জেলির মতো দেহাবরণযুক্ত হওয়ায় দেখতে অনেকটা জেলিফিশের মতো। এরা সাধারণত স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে পারে না এবং সাগরের স্রোতের সঙ্গে ভেসে ভেসে বিশাল ঝাঁক তৈরি করে। মানুষের শরীরে লাগলে চুলকানি সৃষ্টি করে, তবে এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর। এই প্রাণীগুলো মাছের ডিম, পোনা এবং খাদ্যকণাকে নষ্ট করে দেয়, যার ফলে ধীরে ধীরে সাগরে মাছের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইলিশসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক মাছের স্বাভাবিক বিচরণে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।

স্থানীয় মৎস্যজীবীদের অভিজ্ঞতাও এই সংকটের ভয়াবহতার কথা বলছে। সেন্ট মার্টিন বোট মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আবু তালেব জানান, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কিছু ছোট মাছ ধরা গেলেও গত সাত-আট দিন ধরে জেলেদের জালে কার্যত কোনো মাছই উঠছে না। জেলেদের ধারণা, সাগরে নুইন্যার অতিরিক্ত বিস্তারই মাছ উধাও হওয়ার প্রধান কারণ। দিনের পর দিন জাল ফেলেও যখন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না, তখন জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে উপকূলের মানুষের।

এই পরিস্থিতি যাচাই করতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি গবেষক দল সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এবং দ্বীপ থেকে প্রায় ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ২৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জরিপ চালায়। গবেষণায় তারা কয়েক কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত বিশাল ঝাঁকে জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটনের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন, যা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জেলিফিশের প্রাকৃতিক শিকারি হিসেবে পরিচিত কাছিমের সংখ্যা কমে যাওয়াই এই প্রাণীর অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হতে পারে। জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটনের আধিপত্য সামুদ্রিক খাদ্য চক্রে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, যা সমুদ্রজলবায়ুর ভারসাম্যহীনতারই প্রতিফলন।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে। জেলেরা মাছ ধরতে না পারায় আয় কমছে, মাছের পোনা ও ডিম নষ্ট হওয়ায় ভবিষ্যৎ মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে এবং উপকূলীয় এলাকার খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সেন্ট মার্টিনের উপকূলীয় এলাকায় জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটনের এই বিস্তার দীর্ঘমেয়াদে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

এ অবস্থায় পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ নির্ণয়, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার জন্য জরুরি ভিত্তিতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া না হলে সেন্ট মার্টিনের সাগর হারাতে পারে তার প্রাণচাঞ্চল্য, আর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে উপকূলের হাজারো মানুষের জীবন ও জীবিকা।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/