• রবিবার , ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১৯ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আপসহীনতার প্রতীক থেকে চিরবিদায়: যেভাবে খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ‘আপসহীন নেত্রী’

আপসহীনতার প্রতীক থেকে চিরবিদায়: যেভাবে খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ‘আপসহীন নেত্রী’

সজিব হোসেন: মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
সজিব হোসেন: মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০:১৫ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, উত্তাল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলো।

খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের খবর প্রথমে নিশ্চিত করেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন। পরে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে ফোন করে বলেন, “আম্মা আর নেই।” মৃত্যুকালে তাঁর পাশে ছিলেন পরিবারের সদস্যরা। দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থতায় ভুগে চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেন তিনি।

দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামীকাল বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হতে পারে। জাতীয় পর্যায়ে এই জানাজায় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে।

শৈশব, শিক্ষা ও পারিবারিক জীবন

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। যদিও জন্মতারিখ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা মতভেদ রয়েছে। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা বেগম। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। শৈশবে তাঁর নাম ছিল খালেদা খানম, ডাকনাম ‘পুতুল’। দিনাজপুর সরকারি স্কুল ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি।

১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এই দম্পতির সংসারে জন্ম নেন দুই ছেলে—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় মারা যান কোকো। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হলে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে অকালবৈধব্য বরণ করেন খালেদা জিয়া।

রাজনীতিতে প্রবেশ ও নেতৃত্বের উত্থান

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগদানের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। ভাইস চেয়ারম্যান থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়ে ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অনড় অবস্থান ও আপসহীন রাজনীতি তাঁকে গণমানুষের নেত্রীতে পরিণত করে।

প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আরও দুইবার তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রীত্বের পাশাপাশি তিনি একাধিকবার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব ও বহুদলীয় রাজনীতির পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন সংগ্রামী নেত্রী, আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে এক শক্ত অবস্থানের প্রতীক।

কারাবাস, অসুস্থতা ও শেষ সময়

খালেদা জিয়ার জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে কারাবাস ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি কারাগারে যান। গুরুতর অসুস্থতার কারণে ২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাঁর দণ্ড মওকুফ করা হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। দেশে ফিরে বয়সজনিত জটিলতা ও একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকেন। গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাসের বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর অবশেষে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া এই ‘আপসহীন নেত্রী’র ইন্তেকালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোক ও শূন্যতা নেমে এসেছে। ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও আপসহীনতার এক শক্ত প্রতীক হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/