রবিবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৫ | ১৬ ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ০৭:৪৬ ৩০ আগস্ট ২০২৫
থাইল্যান্ডে আবারও রাজনৈতিক ঝড়। এক ফোনকল ফাঁস হয়ে পদচ্যুত হলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা। দেশটির সাংবিধানিক আদালত রায় দিয়েছেন, তিনি নৈতিকতা লঙ্ঘন করেছেন এবং এ কারণে প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকার বৈধতা হারিয়েছেন।
ফোনকলের সূত্রপাত
ঘটনার শুরু গত জুনে। পেতংতার্ন কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের সঙ্গে একটি ফোনকলে অংশ নেন। সেখানে তাঁকে সামরিক বাহিনী সম্পর্কে সমালোচনা করতে ও আপসমূলক মনোভাব প্রকাশ করতে শোনা যায়। পরবর্তীতে এই আলাপ ফাঁস করেন হুন সেন নিজেই।
পেতংতার্নের দাবি ছিল, এটি ছিল কূটনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়া কথা। তবে আদালতের কাছে সেটি প্রমাণ হয়নি। বরং বিচারকদের মতে, ফোনকলটি “রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ও রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছে।”
কেন ক্ষুব্ধ হলেন হুন সেন?
সিনাওয়াত্রা পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও হুন সেন কেন হঠাৎ সম্পর্ক ভেঙে ফেললেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ধারণা করা হয়, পেতংতার্ন একবার মন্তব্য করেছিলেন যে হুন সেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেন, যা “অপেশাদার আচরণ।” এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েই হুন সেন ফোনালাপটি প্রকাশ করেন।
তিনি প্রকাশ্যে বলেন, এটি ছিল “নজিরবিহীন অপমান” এবং তাই তিনি “সত্যটা ফাঁস করেছেন।” এর ফলে কেবল থাইল্যান্ডেই নয়, প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্তেও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। জুলাইয়ে সীমান্ত সংঘাতে দুই দেশের অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারান।
রাজনৈতিক পতনের ধাপগুলো
ফোনকল ফাঁস হওয়ার পর থেকে পেতংতার্ন ক্রমশ রাজনৈতিক সংকটে পড়তে থাকেন।
ফলে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা হলেন থাইল্যান্ডের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী, যিনি আদালতের রায়ে পদচ্যুত হলেন।
সিনাওয়াত্রা পরিবারের রাজনৈতিক অভিশাপ?
থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়—সিনাওয়াত্রা পরিবার ও তাদের মিত্ররা বারবার আদালতের রায়ের শিকার হয়েছেন। পেতংতার্নের বাবা থাকসিন সিনাওয়াত্রা, তাঁর ফুফু ইংলাকসহ পরিবারের চারজন নেতাই এর আগে একই পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন।
এতে থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে একটি ধারণা গড়ে উঠেছে—আদালত সব সময় এমন নেতাদের বিরুদ্ধে রায় দেন, যারা রক্ষণশীল শক্তি ও রাজতন্ত্রপন্থীদের চোখে হুমকি।
নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন?
সংবিধান অনুযায়ী, পার্লামেন্টের সদস্যদের এখন খুব সীমিত একটি তালিকা থেকে নতুন প্রধানমন্ত্রী বেছে নিতে হবে। ফিউ থাই পার্টির শেষ অবশিষ্ট প্রার্থী হলেন চাইকাসেম নিতিসিরি, যিনি একজন সাবেক মন্ত্রী হলেও শারীরিকভাবে দুর্বল ও রাজনৈতিকভাবে তেমন জনপ্রিয় নন।
অন্যদিকে সম্ভাব্য আরেকজন প্রার্থী হলেন ভুমজাইথাই পার্টির নেতা অনুতিন চার্নভিরাকুল। ফোনকল কেলেঙ্কারির পর তাঁর দল জোট থেকে বেরিয়ে যায়। ফলে নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে ফিউ থাইকে তাঁর ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। তবে এই সরকার স্থিতিশীল হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিরোধী দলের অবস্থান
বর্তমানে পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি আসন (১৪৩) রয়েছে বিরোধী দল ‘দ্য পিপলস পার্টির’। কিন্তু তারা ঘোষণা দিয়েছে, নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কোনো জোটে যোগ দেবে না। ফলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠেছে।
জনগণের আস্থা হারাচ্ছে ফিউ থাই
ফিউ থাই পার্টি একসময় থাইল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি ছিল। তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল “ডিজিটাল ওয়ালেট” প্রকল্প—যার আওতায় প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক থাই নাগরিককে দেওয়া হতো ৩০৮ ডলার। কিন্তু সেই প্রকল্প এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
তরুণদের মধ্যেও পেতংতার্নের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের মতে, তিনি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না, বরং তাঁর বাবা থাকসিনই বড় বড় সিদ্ধান্তের পেছনে নিয়ামক ছিলেন।
একটি ফোনালাপের ফাঁস শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনই শেষ করেনি, বরং থাইল্যান্ডকে ঠেলে দিয়েছে নতুন এক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায়। সিনাওয়াত্রা পরিবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তি আজ টলমল করছে, আর দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠছে—থাইল্যান্ডের গণতন্ত্র আসলে কার হাতে নিয়ন্ত্রিত?
বিজ্ঞাপন