• রবিবার , ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১৯ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিটিআরসিকে গ্রামীণফোনের চিঠি-‘দক্ষ অপারেটরকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে’

বিটিআরসিকে গ্রামীণফোনের চিঠি-‘দক্ষ অপারেটরকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে’

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩:২৬ ১৩ অক্টোবর ২০২৫

বাংলাদেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন তাদের ওপর আরোপিত তাৎপর্যপূর্ণ বাজার ক্ষমতা (Significant Market Power - SMP) সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)–কে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। গ্রামীণফোনের দাবি, বিটিআরসির আরোপিত এসব বিধিনিষেধ হাইকোর্টের রায় ও এসএমপি নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এসব নির্দেশনা তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার সুযোগকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিটিআরসি ২০১৮ সালে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় এসএমপি প্রবিধানমালা জারি করে। ওই প্রবিধান অনুযায়ী, কোনো মোবাইল অপারেটরের গ্রাহকসংখ্যা, রাজস্ব বা তরঙ্গ—এই তিন ক্ষেত্রের যেকোনো একটিতে ৪০ শতাংশের বেশি বাজার হিস্যা থাকলে তাকে এসএমপি অপারেটর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই নীতির ভিত্তিতে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রামীণফোনকে এসএমপি অপারেটর ঘোষণা করে বিটিআরসি। এরপর তাদের ওপর কয়েকটি বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

এসএমপি ঘোষণার পর গ্রামীণফোনের ওপর বিটিআরসি যে বিধিনিষেধগুলো আরোপ করে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— নতুন কোনো সেবার প্রচারাভিযান শুরু করার আগে বিটিআরসির অনুমোদন নিতে হবে; নম্বর ঠিক রেখে অপারেটর বদলের (MNP) ক্ষেত্রে গ্রামীণফোনের গ্রাহকদের জন্য ‘লক ইন পিরিয়ড’ ৬০ দিন, অন্যদের জন্য ৯০ দিন; এবং অপারেটরদের মধ্যে আন্তকল (interconnection) চার্জে বৈষম্য রাখা হয়েছে— যেখানে গ্রামীণফোন প্রতি মিনিটে ৭ পয়সা পাবে, অন্যরা পাবে ১০ পয়সা। এসব নির্দেশনা গ্রামীণফোন উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করে, যেখানে হাইকোর্ট বিটিআরসিকে নির্দেশ দেয় নীতিমালার ৯ ধারার আলোকে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে।

গ্রামীণফোন জানায়, ২০২০ সালের জুনে আরোপিত নির্দেশনাগুলো এসএমপি নীতি ও হাইকোর্টের নির্দেশনার লঙ্ঘন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বিটিআরসি এখনো পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত বাজার বিশ্লেষণ বা প্রতিযোগিতা–সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নীতিমালার ৯ ধারায় বলা আছে— যদি কোনো এসএমপি অপারেটরের কার্যক্রমের কারণে বাজার প্রতিযোগিতা কমে যায় বা কমার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু বিটিআরসি কোনো বিশ্লেষণ ছাড়াই এসব বিধিনিষেধ জারি করেছে।

চিঠিতে গ্রামীণফোন আরও উল্লেখ করেছে, অ্যাসিমেট্রিক কল টার্মিনেশন রেট (ভিন্ন ভিন্ন অপারেটরের মধ্যে কল চার্জের বৈষম্য) নীতির কারণে তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাদের দাবি, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত নন-এসএমপি অপারেটররা প্রায় ৬৯০ কোটি টাকা কেটে রেখেছে, যা গ্রামীণফোনের প্রাপ্য ছিল। এতে সরকারও প্রায় ২৭৬ কোটি টাকার কর ও ভ্যাট হারিয়েছে।

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, “আমরা এমন এসএমপি নীতিমালা চাই, যা সঠিক প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখবে। বর্তমান এসএমপি নীতিমালাটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে সবার জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ নিশ্চিত হয়।” তিনি আরও বলেন, “অ্যাসিমেট্রিক ইন্টারকানেকশন রেট কার্যত দক্ষ অপারেটরের আয় কমিয়ে কম দক্ষ অপারেটরকে ভর্তুকি দিচ্ছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি পূর্ণাঙ্গ বাজার বিশ্লেষণ না হওয়া পর্যন্ত এ বৈষম্যমূলক চার্জ প্রত্যাহার করা উচিত।”

অন্যদিকে, টেলিযোগাযোগ খাত সম্প্রতি একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ার পর বিটিআরসি জানিয়েছে, এসএমপি–সংক্রান্ত নির্দেশিকা ও বিধিনিষেধগুলো পর্যালোচনা করা হবে। একজন বিটিআরসি কর্মকর্তা জানান, “এসএমপি–র অধীনে প্রায় ২০ ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে, যার মধ্যে গ্রামীণফোনের ওপর তিনটি কার্যকর। এগুলোর কার্যকারিতা ও বাজারে প্রতিযোগিতার প্রভাব বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

টেলিযোগাযোগ খাতে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছ নীতিমালা নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। একদিকে বিটিআরসি বাজার ভারসাম্য রক্ষায় নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা পালন করছে, অন্যদিকে গ্রামীণফোন বলছে, এসব বিধিনিষেধ উদ্ভাবন ও বিনিয়োগে বাধা দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়— বিটিআরসি গ্রামীণফোনের চিঠির প্রেক্ষিতে কী সিদ্ধান্ত নেয়, এবং তা বাংলাদেশের টেলিকম খাতের প্রতিযোগিতামূলক ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলে।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/