নুরুল হক নুরের জীবনী: শৈশব, আন্দোলন, রাজনীতি ও এমপি হওয়ার গল্প


প্রকাশিত: ০৩:২২ ১৮ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়েকজন তরুণ নেতা আন্দোলনের মাঠ থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে এসেছেন, নুরুল হক নুর তাঁদের অন্যতম। পটুয়াখালীর নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের একটি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা এই তরুণ প্রথমে পরিচিত হন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা হিসেবে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশজুড়ে “ভিপি নুর” নামে পরিচিতি লাভ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক পথ কখনোই সহজ ছিল না। আন্দোলন, হামলা, মামলা, কারাবরণ, দলীয় বিভক্তি, অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে তাঁকে এগোতে হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি তরুণদের অধিকার, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, প্রবাসী শ্রমিক এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মতো বিষয় নিয়ে কথা বলে একটি স্বতন্ত্র সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করেছেন।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে বিজয়ী হওয়ার পর “ভিপি নুর” পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে “এমপি নুর” পরিচয়। এরপর তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেও যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি সংসদ সদস্য এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এই জীবনীতে নুরুল হক নুরের শৈশব, শিক্ষাজীবন, পরিবার, ছাত্ররাজনীতি, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, ডাকসু নির্বাচন, রাজনৈতিক দল গঠন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে ভূমিকা, বিভিন্ন বিতর্ক, সংসদ সদস্য হওয়া এবং বর্তমান রাজনৈতিক জীবন বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
নুরুল হক নুরের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
- পূর্ণ নাম: মো. নুরুল হক
- জনপ্রিয় নাম: ভিপি নুর, এমপি নুর
- জন্মস্থান: চরবিশ্বাস ইউনিয়ন, গলাচিপা, পটুয়াখালী
- শিক্ষা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ
- রাজনৈতিক দল: গণঅধিকার পরিষদ
- গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়: ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা, ডাকসুর সাবেক ভিপি
- নির্বাচনী এলাকা: পটুয়াখালী-৩, গলাচিপা ও দশমিনা
- বর্তমান দায়িত্ব: সংসদ সদস্য এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী
- স্ত্রী: মারিয়া আক্তার
- সন্তান: দুই মেয়ে ও এক ছেলে
জন্ম ও শৈশব
নুরুল হক নুরের জন্ম পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নে। নদী ও চরবেষ্টিত এই অঞ্চলটি দেশের অনেক প্রত্যন্ত জনপদের মতোই দীর্ঘদিন যোগাযোগ, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিল। এমন একটি জায়গা থেকে উঠে এসে জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নেওয়া তাঁর জীবনের অন্যতম আলোচিত দিক।
তাঁর বাবা ইদ্রিস হাওলাদার চরবিশ্বাস ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য। মা নিলুফা বেগম ছিলেন গৃহিণী। নুরের বয়স যখন প্রায় আড়াই বছর, তখন তাঁর মা মারা যান। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের পরিবারে তিনি চতুর্থ সন্তান। খুব অল্প বয়সে মাকে হারানো এবং বড় পরিবারের মধ্যে বেড়ে ওঠা তাঁর শৈশবকে অন্য অনেক শিশুর তুলনায় কঠিন করে তোলে।
নুরের বাবা চেয়েছিলেন ছেলে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হোক। আর্থিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীকালে নুর যখন আন্দোলন, মামলা এবং কারাবরণের মধ্যে পড়েন, তখন তাঁর পরিবারকে দীর্ঘ সময় উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়েছে। তাঁর বাবা পরে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ছেলেকে সংসদ সদস্য হিসেবে দেখবেন, এমনটি তিনি কখনো কল্পনা করেননি।
গ্রামের স্কুল থেকে ঢাকার শিক্ষাজীবন
নুরুল হক নুর চরবিশ্বাস জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর উন্নত শিক্ষার সুযোগের জন্য গ্রাম ছেড়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে চলে যান। সেখানে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন।
তিনি ২০১০ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট বা এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে ঢাকার উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০১২ সালে উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি সম্পন্ন করেন। গ্রামের সীমিত পরিবেশ থেকে ঢাকা শহরের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল।
এইচএসসি শেষ করার পর নুর পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে প্রায় এক বছর পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আসার পরই তাঁর জীবনের রাজনৈতিক অধ্যায় দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে নুরুল হক নুর বিবাহিত। তাঁর স্ত্রীর নাম মারিয়া আক্তার। তিনি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। তাঁদের দুই মেয়ে এবং এক ছেলে রয়েছে। রাজনৈতিক ব্যস্ততা, মামলা, গ্রেপ্তার এবং শারীরিক হামলার কারণে নুরের পরিবারকে বিভিন্ন সময়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালে নুর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে স্বামীর শারীরিক অবস্থার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক জীবনে নুরকে জনসমক্ষে বেশি দেখা গেলেও তাঁর পরিবার তুলনামূলকভাবে প্রচারের বাইরে থাকে।
ছাত্ররাজনীতিতে নুরুল হক নুরের শুরু
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় নুরুল হক নুর কিছুদিন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পরিচিত নেতা ছিলেন না। পরবর্তীতে প্রচলিত দলীয় ছাত্ররাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি ও অধিকারভিত্তিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।
এই পরিবর্তন তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বড় বাঁক তৈরি করে। প্রচলিত ছাত্রসংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে তিনি এমন একটি প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হন, যার মূল বক্তব্য ছিল সরকারি চাকরিতে বৈষম্য কমানো এবং মেধাভিত্তিক সুযোগ বৃদ্ধি করা।
তাঁর সমর্থকেরা এই পরিবর্তনকে স্বাধীন রাজনৈতিক চিন্তার প্রকাশ হিসেবে দেখেন। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, নুরের রাজনৈতিক অবস্থান সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে। তবে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছাত্রলীগের সঙ্গে প্রাথমিক সম্পৃক্ততার পর তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অধিকারভিত্তিক আন্দোলন এবং নিজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই যুক্ত থেকেছেন।
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন
নুরুল হক নুর জাতীয়ভাবে পরিচিতি পান ২০১৮ সালের সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে। সে সময় তিনি বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্যতম যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। সংগঠনটি সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার সংস্কার, মেধাভিত্তিক নিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈষম্য কমানোর দাবিতে আন্দোলন করে।
আন্দোলনটি দ্রুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। নুর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা, সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য প্রদান, শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করা এবং সরকারের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করেন। এই আন্দোলনের সময় তিনি একাধিকবার হামলা, বাধা এবং আটক হওয়ার অভিযোগ করেন।
সরকার শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সাফল্য নুরকে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের কাছে অধিকার আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০২৪ সালে কোটা প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এলে সংবাদমাধ্যমও তাঁকে ২০১৮ সালের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে উল্লেখ করে।
ডাকসু নির্বাচনে ভিপি নুরের উত্থান
২০১৯ সালে দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নুরুল হক নুর কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা প্যানেল থেকে সহসভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
নির্বাচনে তিনি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের প্রার্থীকে পরাজিত করে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। এই বিজয় তাঁকে ছাত্র আন্দোলনের নেতা থেকে জাতীয়ভাবে পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। তখন থেকেই তিনি “ভিপি নুর” নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত হতে থাকেন।
তবে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে নতুন নির্বাচন দাবি করে। নুর নিজেও নির্বাচনকে পুরোপুরি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকার করেননি এবং পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলেন। ফলে তাঁর বিজয় যেমন আলোচিত হয়, তেমনি ফলাফল গ্রহণ এবং পুনর্নির্বাচন দাবি করার অবস্থানও প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
ডাকসুর ভিপি হিসেবে নুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, রাজনৈতিক হামলা এবং জাতীয় ইস্যুতে বক্তব্য দিতে থাকেন। তাঁর দায়িত্বকালে তিনি এবং তাঁর সমর্থকেরা কয়েকবার হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন।
ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ
ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নুর শুধু ছাত্ররাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি ছাত্র অধিকার পরিষদের পাশাপাশি যুব, শ্রমিক এবং প্রবাসীদের জন্য পৃথক অধিকারভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়াকে আহ্বায়ক এবং নুরুল হক নুরকে সদস্যসচিব করে বাংলাদেশ গণঅধিকার পরিষদ নামে নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণা করা হয়। দলটির নেতাদের বড় অংশই কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ছাত্র অধিকার পরিষদ থেকে উঠে আসেন। দলটি নিজেদের প্রচলিত দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারার বিকল্প শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।
গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, রাষ্ট্র সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং প্রবাসীদের অধিকার দলটির বক্তব্যে গুরুত্ব পেতে থাকে। তবে নতুন দল হিসেবে সাংগঠনিক বিস্তার, অর্থায়ন, নেতৃত্বের সমন্বয় এবং রাজনৈতিক জোট নির্ধারণে দলটি দ্রুত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
নুরুল হক নুর কি বারবার দল পরিবর্তন করেছেন?
নুরুল হক নুরের রাজনৈতিক যাত্রাকে অনেক সময় “দল পরিবর্তন” হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে বিষয়টি আরও নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকে তিনি কিছু সময় ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে সেখান থেকে সরে এসে কোটা সংস্কার ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকারভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করেন। এরপর সেই আন্দোলনভিত্তিক নেতৃত্বকে জাতীয় রাজনীতিতে রূপ দিতে গণঅধিকার পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও গণঅধিকার পরিষদ ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেননি। তিনি নিজের দলের সভাপতি এবং নিজের দলের নির্বাচনী প্রতীক “ট্রাক” নিয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাই এটিকে সরাসরি দলবদলের চেয়ে নির্বাচনী জোট বা রাজনৈতিক সমঝোতা বলা অধিক নির্ভুল।
গণঅধিকার পরিষদের বিভক্তি
২০২৩ সালে গণঅধিকার পরিষদের ভেতরে বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকট দেখা দেয়। দলের আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়া এবং সদস্যসচিব নুরুল হক নুর পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষ একে অপরকে দলীয় পদ থেকে অপসারণের ঘোষণা দেয়।
নুরপন্থী নেতারা অভিযোগ করেন, রেজা কিবরিয়া দলীয় কার্যক্রমে যথেষ্ট সক্রিয় নন এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। অন্যদিকে রেজা কিবরিয়া ও তাঁর সমর্থকেরা নুরের রাজনৈতিক যোগাযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দল পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
২০২৩ সালের ১০ জুলাই নুরপন্থী অংশ কাউন্সিল আয়োজন করে নুরুল হক নুরকে সভাপতি এবং রাশেদ খানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে। এর ফলে গণঅধিকার পরিষদ কার্যত দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদ নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভ করে।
২০২৪ সালের আন্দোলনে নুরুল হক নুরের ভূমিকা
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরুণ সমন্বয়কদের নেতৃত্বে শুরু হয়। তাই নুরুল হক নুরকে এই আন্দোলনের প্রধান ছাত্র সমন্বয়ক বলা সঠিক হবে না। তবে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অভিজ্ঞ নেতা এবং একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সভাপতি হিসেবে তিনি আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান।
২০২৪ সালের ৪ জুলাই নুর অভিযোগ করেন, সরকার আগের মীমাংসিত কোটা ইস্যু নতুন করে সামনে এনে দেশের দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যান্য সমস্যা আড়াল করতে চাইছে। তাঁর দল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানায় এবং সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকে।
পরবর্তীতে কোটা সংস্কারের দাবি সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি এতে যুক্ত হয়। নুরের ভূমিকা ছিল মূল ছাত্র নেতৃত্বের বাইরে থাকা একজন অভিজ্ঞ আন্দোলনকারী ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সমর্থন দেওয়া, বক্তব্য রাখা এবং তাঁর দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করা।
গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও নির্যাতনের অভিযোগ
২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নুরুল হক নুরকে গ্রেপ্তার করে। তাঁকে ১৮ জুলাই সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আদালত প্রথমে তাঁকে রিমান্ডে পাঠায় এবং রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
নুরের স্ত্রী মারিয়া আক্তার অভিযোগ করেন, নুরকে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় তাঁর অবস্থান জানানো হয়নি এবং রিমান্ডে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। আদালতে আনার সময় তিনি এতটাই দুর্বল ছিলেন যে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিলেন না বলেও পরিবার ও সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়। এগুলো তাঁর পরিবারের অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বিচারিক সিদ্ধান্ত ছাড়া নির্যাতনের অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উল্লেখ করা উচিত নয়।
এই গ্রেপ্তার নুরকে ২০২৪ সালের আন্দোলনের রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নেতাদের একজন হিসেবে নতুন করে আলোচনায় আনে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বিবৃতিতেও জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁর গ্রেপ্তার ও ত্যাগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন লাভ
২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদ নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভ করে। দলটির নির্বাচনী প্রতীক নির্ধারণ করা হয় “ট্রাক”।
রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পাওয়া নুরের জন্য বড় অর্জন ছিল। কারণ এর মাধ্যমে তাঁর আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নির্বাচনে নিজস্ব নাম ও প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
হামলা, মামলা ও রাজনৈতিক সংঘাত
নুরুল হক নুরের রাজনৈতিক জীবনে হামলা ও মামলা বারবার ফিরে এসেছে। ২০১৯ সালে নিজ এলাকায় যাওয়ার সময় তাঁর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। একই বছরের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা আহত হন।
২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় একটি ছাত্রসমাবেশেও তাঁর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনের হলফনামার তথ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানায়, বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা হয়েছে। তাঁর পরিবারের দাবি, তিনি আরও বহুবার শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা প্রত্যেকটি মামলা একই প্রকৃতির নয় এবং মামলা হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। কিছু মামলা রাজনৈতিক বক্তব্য ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছিল।
নুরুল হক নুরকে ঘিরে উল্লেখযোগ্য বিতর্ক
দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব
গণঅধিকার পরিষদের বিভক্তি নুরের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক বিতর্কগুলোর একটি। সমালোচকেরা তাঁর নেতৃত্বের পদ্ধতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেন্দ্রীকরণের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য, দলের নিষ্ক্রিয়তা ও অনিয়ম মোকাবিলায় কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছিল।
মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ
২০২৩ সালে ইসরায়েলি নাগরিক মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে নুরের কথিত সাক্ষাৎ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। নুর প্রকাশ্যে ওই বৈঠকের খবর অস্বীকার করেন এবং একে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণা বলে দাবি করেন। তবে তাঁর দলের ভিন্নমতাবলম্বী কয়েকজন নেতা দাবি করেছিলেন, এমন বৈঠক হয়েছিল। অভিযোগ ও অস্বীকার দুই পক্ষ থেকেই এলেও প্রকাশ্য নিরপেক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর করা মামলা
২০২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর করা ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায় নুরসহ কয়েকজনের নাম আসে। নুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল মূল অপরাধে অংশ নেওয়া নয়, বরং অভিযোগের প্রতিকার না করা ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করার মতো বিষয় ঘিরে। ২০২১ সালে ঢাকার একটি ট্রাইব্যুনাল নুরসহ পাঁচজনকে ওই মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়। ফলে এই ঘটনাটি উল্লেখ করার সময় আদালতের অব্যাহতির বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি।
নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে নোটিশ
২০২৬ সালের নির্বাচনের সময় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নুরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এটি অভিযোগের ভিত্তিতে দেওয়া প্রশাসনিক নোটিশ ছিল, কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা নয়।
২০২৫ সালের গুরুতর হামলা
২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার কাকরাইল এলাকায় জাতীয় পার্টির কার্যালয় ঘিরে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের সময় নুরুল হক নুর গুরুতর আহত হন। কারা প্রথম হামলা শুরু করেছিল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে পার্থক্য ছিল।
চিকিৎসকেরা জানান, নুরের মাথায় আঘাত এবং নাকের হাড়ে ভাঙন ছিল। তিনি দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সিঙ্গাপুরে যান।
ঘটনাটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আরেকটি বড় শারীরিক ও মানসিক ধাক্কা ছিল। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করে।
পটুয়াখালী-৩ আসনে সংসদ সদস্য হওয়া
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নুরুল হক নুর পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আসনটি গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা নিয়ে গঠিত।
তিনি গণঅধিকার পরিষদের “ট্রাক” প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটের সমর্থন পান। প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীও প্রকাশ্যে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
চরবিশ্বাসের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে নিজ এলাকার সংসদ সদস্য হওয়া নুরের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় নির্বাচনী অর্জন। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন ও জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও এটিই ছিল তাঁর প্রথম জাতীয় সংসদে প্রবেশ।
প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পর নুরুল হক নুর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। প্রাথমিক দায়িত্ব বণ্টনে তাঁকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সরকারি ও সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তিনি বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া, প্রতারণামূলক নিয়োগ, মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, প্রবাসীদের নিরাপত্তা এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের কল্যাণ নিয়ে কাজ করছেন।
আন্দোলনের রাজনীতি থেকে প্রশাসনিক দায়িত্বে প্রবেশ তাঁর জন্য নতুন পরীক্ষা। বিরোধী নেতা হিসেবে সরকারের সমালোচনা করা এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে বাস্তব সমস্যা সমাধান করা দুটি ভিন্ন ধরনের কাজ। ফলে তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক মূল্যায়ন অনেকাংশে নির্ভর করবে প্রবাসী কর্মীদের খরচ কমানো, দালাল ও প্রতারক নিয়ন্ত্রণ, নতুন শ্রমবাজার তৈরি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের সুরক্ষায় তিনি কতটা ফলপ্রসূ কাজ করতে পারেন তার ওপর।
নুরুল হক নুরের বর্তমান জীবন
বর্তমানে নুরুল হক নুর তিনটি বড় পরিচয় বহন করছেন। তিনি পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী।
তাঁর সময় এখন দলীয় রাজনীতি, সংসদীয় কার্যক্রম, নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে ভাগ হচ্ছে। পটুয়াখালীর গলাচিপা ও দশমিনার মানুষ তাঁর কাছে যোগাযোগব্যবস্থা, নদীভাঙন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় উন্নয়নের প্রত্যাশা করছেন। অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ে তাঁর দলের সমর্থকেরা গণতান্ত্রিক সংস্কার, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং অধিকারভিত্তিক রাজনীতির প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চান।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে তাঁর কাজও কঠিন। বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে যেতে অতিরিক্ত খরচ, নিয়োগ প্রতারণা, পাসপোর্ট জটিলতা, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, মৃত কর্মীদের মরদেহ ফেরত আনা এবং সংকুচিত শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারের মতো সমস্যা তাঁকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার এবং অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক শক্তি ও সীমাবদ্ধতা
নুরুল হক নুরের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আন্দোলন থেকে উঠে আসা পরিচিতি। তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান নন। সাধারণ পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর উত্থান তরুণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের একটি অংশের কাছে অনুপ্রেরণার বিষয়।
তিনি সহজ ভাষায় বক্তব্য দেন, দ্রুত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানান এবং মাঠের কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকেন। হামলা, মামলা ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা তাঁর সমর্থকদের কাছে তাঁকে সাহসী ও আপসহীন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অন্যদিকে তাঁর সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে দলীয় বিভক্তি, সাংগঠনিক স্থায়িত্বের প্রশ্ন, বিতর্কিত বক্তব্য, নেতৃত্ব নিয়ে অভিযোগ এবং নীতিগত অবস্থানে ধারাবাহিকতা প্রমাণের প্রয়োজন। আন্দোলনকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তাকে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলে রূপ দেওয়া তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এখন তিনি সরকারে থাকায় শুধু প্রতিবাদ বা সমালোচনা নয়, কার্যকর সিদ্ধান্ত ও পরিমাপযোগ্য ফলাফল দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাঁর বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয় ও জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সফল হলে তিনি তরুণ আন্দোলনকারী থেকে কার্যকর জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার সুযোগ পাবেন।
শেষ কথা
নুরুল হক নুরের জীবন বাংলাদেশের একজন প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীর জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসার ব্যতিক্রমী গল্প। মাকে হারানো শৈশব, গ্রামের সীমিত শিক্ষাব্যবস্থা, ঢাকায় এসে পড়াশোনা, কোটা সংস্কার আন্দোলন, ডাকসুর ভিপি নির্বাচন, হামলা, মামলা, কারাবরণ, রাজনৈতিক দল গঠন এবং অবশেষে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়া তাঁর জীবনকে ঘটনাবহুল করে তুলেছে।
তবে তাঁর জীবনের গল্প এখনো শেষ হয়নি। বরং এমপি এবং প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। আন্দোলনের নেতা হিসেবে সাহস দেখানো এক বিষয়, আর রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ হয়ে মানুষের সমস্যার কার্যকর সমাধান দেওয়া আরেক বিষয়।
ইতিহাস নুরুল হক নুরকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা নির্ভর করবে তিনি ক্ষমতা ও দায়িত্বকে কীভাবে ব্যবহার করেন তার ওপর। তিনি কি অধিকারভিত্তিক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে পারবেন? নিজের দলকে একটি গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারবেন? প্রবাসী কর্মী এবং নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারবেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। তবে এতটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, চরবিশ্বাসের সাধারণ পরিবারের সন্তান নুরুল হক নুর ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে নিজের জন্য একটি আলোচিত স্থান তৈরি করেছেন।
তথ্য হালনাগাদ: ১৮ জুলাই ২০২৬। রাজনৈতিক পদ ও দায়িত্ব পরিবর্তনশীল হওয়ায় জীবনীটি মাসিকভাবে হালনাগাদ করার নজরদারি সেট করা যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সর্বোচ্চ পঠিত - জীবনী
- নুরুল হক নুরের জীবনী: শৈশব, আন্দোলন, রাজনীতি ও এমপি হওয়ার গল্প
- চড়া শাকসবজির বাজার, বেড়েছে ফার্মের মুরগির দাম
- শিশুসন্তানসহ ভারতীয় নারীকে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ে পুশ-ইনের অভিযোগ
- ভাইজান আগেই বুঝেছিলেন সোনাক্ষী-জাহিরের প্রেম, বলেছিলেন বিচ্ছেদের কথা
- প্রথমবার বিশ্বকাপজয়ীদের জন্য চ্যাম্পিয়নশিপ রিং, নতুন ইতিহাস গড়ছে ফিফা
- সাদা পোশাকে সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিয়ে গেল দিল্লি পুলিশ
- বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকারি সহায়তা চলবে: অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী
- মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে ৭ মাসের শিশুকে হ*ত্যা, গ্রেপ্তার বাবা
- অবশেষে বিয়ে নিয়ে মুখ খুললেন দীঘি !
- প্রথমবারের মতো হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন চালু করল ভারত
- জনগণের প্রতিনিধি শামীম কায়সার লিংকনের জীবন ও রাজনৈতিক পথচলা
- ডা. শফিকুর রহমান: জীবন, চিকিৎসা পেশা ও রাজনৈতিক পথচলা
- মূল্যবান বস্তু ভেবে বাড়িতে নিলেন, পরে জানা গেল মর্টার শেল!
- এক সময় ঘুমাতেন রাস্তায়, আজ বিশ্বকাপের নায়ক
- বিশ্বকাপ অনুশীলনে রহস্যময় ড্রোন, উদ্বেগে দক্ষিণ কোরিয়া শিবির
- মাদক সেবনের ভিডিও ভাইরাল, দলীয় পদ হারালেন বিএনপির দুই নেতা!
- ত্রিশালে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মসজিদের ইমাম গ্রেপ্তার
- সৌদিতে শুটিংয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করলেন হলিউড অভিনেতা জিয়ানকার্লো এসপোসিতো
- যাত্রা ও সার্কাস ফিরিয়ে আনতে বড় উদ্যোগ, অনুমতি দেবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়
- ধাপে ধাপে হবে স্থানীয় সরকার ভোট, শেষ হতে পারে ২০২৭ সালে




