• শুক্রবার , ১০ জুলাই, ২০২৬ | ২৬ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাওরের সন্তান থেকে সংসদে: মো. ফজলুর রহমানের জীবন, রাজনীতি ও বিতর্ক

হাওরের সন্তান থেকে সংসদে: মো. ফজলুর রহমানের জীবন, রাজনীতি ও বিতর্ক

হাওরের সন্তান থেকে সংসদে: মো. ফজলুর রহমানের জীবন, রাজনীতি ও বিতর্ক

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫:৩৬ ১০ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মো. ফজলুর রহমান এমন এক চরিত্র, যাকে শুধু একটি দল, একটি নির্বাচন কিংবা একটি আলোচিত বক্তব্য দিয়ে বোঝা কঠিন। তার রাজনৈতিক জীবনে রয়েছে পাকিস্তান আমলের ছাত্র আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, আওয়ামী লীগের হয়ে সংসদ সদস্য হওয়া, স্বতন্ত্র রাজনীতি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বিএনপির নেতৃত্ব এবং প্রায় চার দশক পর আবার জাতীয় সংসদে ফেরার গল্প।

তিনি পেশায় আইনজীবী, পরিচয়ে প্রবীণ রাজনীতিক এবং বর্তমানে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য। তবে দেশজুড়ে তার সাম্প্রতিক পরিচিতি তৈরি হয়েছে সরাসরি, আবেগপ্রবণ ও কখনো তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষ তাকে ব্যঙ্গ করে ‘ফজু পাগলা’ নামে ডাকতে শুরু করলেও পরে তিনি নিজেই নামটিকে হাস্যরসের সঙ্গে গ্রহণ করেন। ফলে বিরোধীদের দেওয়া একটি নাম শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের অংশ হয়ে ওঠে। 

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয় পান ফজলুর রহমান। নির্বাচন কমিশনের ফল সংগ্রহ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত হিসাবে তিনি ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৭২ ভোট পান। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর রোকন রেজা শেখ পান ৫৭ হাজার ৮২৯ ভোট। দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর এই জয় তাকে আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

একনজরে মো. ফজলুর রহমান

পূর্ণ নাম: মো. ফজলুর রহমান
পরিচিতি: রাজনীতিক, আইনজীবী ও সংসদ সদস্য
নির্বাচনী এলাকা: কিশোরগঞ্জ-৪, ইটনা–মিঠামইন–অষ্টগ্রাম
বর্তমান রাজনৈতিক দল: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি
আগের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা: আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ
পেশা: আইনজীবী
শিক্ষা: গুরুদয়াল সরকারি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
স্ত্রী: অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম রেখা
আলোচিত পরিচয়: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক ছাত্রনেতা এবং ‘ফজু পাগলা’ নামে সামাজিক মাধ্যমে পরিচিত
জন্মতারিখ: নির্ভরযোগ্য উন্মুক্ত উৎসে সুনির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি।

হাওরের গ্রামে শৈশব

মো. ফজলুর রহমানের জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের করণসি বা জয়সিদ্ধি এলাকার একটি গ্রামে। প্রকাশিত বিভিন্ন জীবনীতে স্থানটির বানানে কিছু পার্থক্য দেখা গেলেও এটি নিশ্চিত যে হাওরবেষ্টিত ইটনা অঞ্চলেই তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে।

ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের জীবন বাংলাদেশের অন্য অনেক অঞ্চলের চেয়ে আলাদা। বর্ষায় বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়, যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে নৌকা। শুকনা মৌসুমে আবার কৃষি, মাছ ধরা ও হাওরনির্ভর অর্থনীতিকে ঘিরে মানুষের ব্যস্ততা বাড়ে। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠায় হাওরের মানুষের যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সংকট তার রাজনৈতিক বক্তব্যে বারবার এসেছে।

নিজ এলাকার প্রতি এই আবেগের একটি উদাহরণ জয়সিদ্ধি উচ্চবিদ্যালয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাকে বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে তিনি হাওর এলাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করার কথাও বলেন। তার যুক্তি ছিল, উচ্চশিক্ষার জন্য হাওরের ছেলেমেয়েদের যেন সব সময় দূরের শহরে চলে যেতে না হয়। 

পড়াশোনা ও রাজনৈতিক চেতনার শুরু

ফজলুর রহমান ইটনা হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন বলে প্রকাশিত জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। 

তার ছাত্রজীবনের সময়টি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল অধ্যায়গুলোর একটি। বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতার আন্দোলন তখন ছাত্রসমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছিল। ফজলুর রহমানও ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

নিজের এক স্মৃতিচারণে তিনি বলেছেন, ১৯৬৪ সালে গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানকে কাছ থেকে দেখেছিলেন। এই স্মৃতি তার ব্যক্তিগত ভাষ্য হলেও তার রাজনৈতিক চিন্তায় বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রভাব বোঝাতে তিনি প্রায়ই ঘটনাটি উল্লেখ করেন।

বিভিন্ন জীবনী ও সংবাদ প্রতিবেদনে ফজলুর রহমানকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি ঠিক কোন মেয়াদে এবং ছাত্রলীগের কোন সাংগঠনিক পর্যায়ে এ দায়িত্বে ছিলেন, সে বিষয়ে উন্মুক্ত উৎসগুলোতে পূর্ণাঙ্গ ও একরকম তথ্য পাওয়া যায় না। জীবনীতে এ ধরনের অস্পষ্টতা থাকায় পদগুলোর উল্লেখ করার সময় প্রকাশিত সূত্রের ভাষ্যের ওপর নির্ভর করাই নিরাপদ। 

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা

মুক্তিযুদ্ধ ফজলুর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের আগেই তিনি বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স বা বিএলএফের সদস্য ছিলেন। ভারতে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন এবং পরে কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে মুজিব বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রোফাইলেও তাকে কিশোরগঞ্জ জেলার মুজিব বাহিনীর প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

তার বক্তব্যে ১৯৭১ সালের স্মৃতি প্রায়ই আবেগপূর্ণভাবে ফিরে আসে। যুদ্ধের সময় সহযোদ্ধাদের হারানো, নদী পাড়ি দেওয়া, গুলির মুখে চলাচল এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন। এগুলো মূলত তার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ; প্রত্যেকটি ঘটনার স্বাধীন নথি উন্মুক্ত উৎসে পাওয়া যায় না। তাই তার যুদ্ধকালীন বিবরণকে তার নিজের বর্ণনা হিসেবেই উপস্থাপন করা উচিত।

তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে সংশয় কেন ছড়িয়েছে

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি ছড়ায় যে, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের তালিকায় নাকি ফজলুর রহমানের নাম নেই। একটি ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদনে দাবিটিকে বিভ্রান্তিকর বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, আদালতের বক্তব্য এবং একাধিক জাতীয় গণমাধ্যমে তাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘মো. ফজলুর রহমান’ বাংলাদেশে অত্যন্ত পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত নাম। শুধু নাম লিখে সরকারি তালিকায় অনুসন্ধান করলে একই নামের অনেক ব্যক্তির তথ্য আসতে পারে। বাবার নাম, গ্রামের নাম, গেজেট নম্বর বা অন্যান্য পরিচয় মিলিয়ে না দেখে কেবল একটি সাধারণ অনুসন্ধানের ফল দিয়ে কারও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করা যায় না।

এই জীবনী তৈরিতে পর্যালোচনা করা নির্ভরযোগ্য উৎসে তার মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে, এমন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় পাওয়া যায়নি। তবে তার যুদ্ধকালীন দায়িত্বের পূর্ণাঙ্গ নথি জনসাধারণের জন্য সহজে পাওয়া যায় না। এ কারণেই রাজনৈতিক সমালোচকরা প্রশ্ন তোলার সুযোগ পান। তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিযোগের চেয়ে সরকারি নথি, গেজেট ও যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক দলিলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আইনজীবী হিসেবে পেশাজীবন

রাজনীতির পাশাপাশি ফজলুর রহমান আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন আদালতসংক্রান্ত প্রতিবেদনে তাকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি নিজেও বলেছেন, রাজনীতি তার প্রধান কাজ হলেও জীবন-জীবিকার জন্য তিনি ওকালতি করেন।

আইনের ভাষা, সাংবিধানিক বিষয় এবং আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক বক্তৃতাতেও দেখা যায়। তবে একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হয়েও ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে একটি মন্তব্যের কারণে তাকে আদালতে হাজির হতে হয়েছিল। টেলিভিশনের এক আলোচনায় তিনি ট্রাইব্যুনালকে মানেন না—এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে আদালতে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা চান এবং মন্তব্যটি মুখ ফসকে হয়ে থাকতে পারে বলে ব্যাখ্যা দেন। ট্রাইব্যুনাল ক্ষমার আবেদন গ্রহণ করে তাকে অব্যাহতি দেয়।

এই ঘটনা তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তুলে ধরে। তিনি যেমন আদালতের অভিজ্ঞ আইনজীবী, তেমনি আবেগের মুহূর্তে বলা একটি বাক্য তাকে আদালত অবমাননার অভিযোগের মুখে ফেলেছিল। তার সমালোচকেরা ঘটনাটিকে দায়িত্বহীন বক্তব্যের উদাহরণ বলেন। সমর্থকেরা দেখান, তিনি ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন এবং আদালতও বিষয়টির নিষ্পত্তি করেছে।

পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন

ফজলুর রহমানের স্ত্রী অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম রেখাও একজন আইনজীবী। প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক ও আইনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে স্বামীর পাশে দেখা যায়। 

২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় ফজলুর রহমানের সঙ্গে তার স্ত্রী এবং ছেলে ব্যারিস্টার অনিক রহমান উপস্থিত ছিলেন বলে সমকালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার মোট সন্তানসংখ্যা, সন্তানদের ব্যক্তিগত জীবন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য উন্মুক্ত তথ্য সীমিত।

২০২৫ সালে তার বাসার সামনে বিক্ষোভের পর তিনি নিজের পাশাপাশি স্ত্রী ও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সে সময় তিনি জানান, সেগুনবাগিচায় একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকেন। রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া পরিবারের ওপর পড়ায় তিনি বিষয়টিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেন। 

আওয়ামী লীগে রাজনৈতিক উত্থান

ফজলুর রহমানের মূল রাজনৈতিক উত্থান আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে। তিনি একসময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

কিন্তু আওয়ামী লীগে তার অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। স্থানীয় নেতৃত্ব, মনোনয়ন এবং প্রভাব বিস্তার নিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা ও পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি হওয়া মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে তার বিরোধের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ফজলুর রহমানের নিজের অভিযোগ, ওই বিরোধের কারণে তাকে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকটি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয় এবং আবদুল হামিদ বা তার পক্ষের বক্তব্য সব প্রতিবেদনে পাওয়া যায় না।

১৯৯১ সালে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ১৯৯৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ২০০১ সালে কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে প্রকাশিত রাজনৈতিক জীবনীতে উল্লেখ আছে।

আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে

ফজলুর রহমানের বিএনপিতে যোগ দেওয়ার সাল নিয়ে প্রকাশিত উৎসে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কোনো প্রতিবেদনে ২০০১ সাল, আবার কোথাও ২০০৫ সালের কথা বলা হয়েছে। তবে এটি নিশ্চিত যে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের অধ্যায়ের পর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন।

একসময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন ব্যক্তির বিএনপিতে যোগ দেওয়া স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে। সমালোচকেরা একে দলবদল বা সুবিধাভিত্তিক রাজনীতি হিসেবে দেখেন। ফজলুর রহমানের বক্তব্য হলো, তিনি আওয়ামী লীগের আদর্শিক ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করলেও পরবর্তী সময়ের অনিয়ম, কর্তৃত্ববাদ ও ভোটব্যবস্থার কারণে দলটি থেকে দূরে গেছেন।

২০২৩ সালে আওয়ামী লীগে ফিরে যাওয়ার গুঞ্জনের জবাবে তিনি প্রকাশ্যে তা প্রত্যাখ্যান করেন। রাতের ভোট, অনিয়ম এবং দলীয় নেতাদের আচরণ নিয়ে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার প্রশ্নই নেই। তার এসব বক্তব্য একদিকে সরকারবিরোধী মানুষের প্রশংসা পায়, অন্যদিকে ব্যবহৃত তির্যক শব্দ ও উদাহরণ নিয়ে সমালোচনা হয়। 

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তার রাজনীতি

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ফজলুর রহমান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় তিনি নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি করতে পারেননি বলে স্থানীয় সংবাদে দাবি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর প্রায় ১৫ বছর পর নিজ এলাকায় বড় সমাবেশ করার খবর প্রকাশিত হয়।

ফজলুর রহমানের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি মামলা, হয়রানি ও রাজনৈতিক বাধার শিকার হয়েছেন। তার নেতাকর্মীদের ওপরও হামলা-মামলা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং এলাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের সব অংশের বিপরীতে সরকারি বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য একই প্রতিবেদনে নেই। তাই এগুলোকে তার রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি টেলিভিশন টক শো, সভা ও অনলাইন আলোচনায় বিএনপির পক্ষে কথা বলেছেন। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনব্যবস্থা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্যের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। বিএনপিকে দেওয়া লিখিত জবাবে তিনি দাবি করেন, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর দলের কঠিন সময়ে নিয়মিত টেলিভিশন ও অনলাইন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করেছেন। এটি তার নিজস্ব দাবি; তাকে আন্দোলনের প্রধান সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বাধীন প্রমাণ সীমিত।

২০২৪ সালের আন্দোলনে ফজলুর রহমানের ভূমিকা

জুলাই ২০২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরবর্তী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নিজের ভূমিকা নিয়ে ফজলুর রহমান একাধিক দাবি করেছেন। বিএনপির কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে তিনি বলেন, আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের চাকরির দাবির পাশাপাশি গণতন্ত্রের দাবিতে সোচ্চার হতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তিনি আরও দাবি করেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তবে উন্মুক্ত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে তাকে জুলাই আন্দোলনের মাঠপর্যায়ের সংগঠক, সমন্বয়ক বা সামনের সারির অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিয়মিত দেখা যায় না। তাই তার ভূমিকার সবচেয়ে নির্ভুল বর্ণনা হবে—তিনি বিএনপির একজন প্রবীণ নেতা হিসেবে সরকারবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন এবং আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন; কিন্তু আন্দোলনের সরাসরি সাংগঠনিক নেতৃত্বে তার ভূমিকা নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত।

৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তিনি কিশোরগঞ্জে ফিরে গিয়ে নেতাকর্মীদের প্রতিশোধ, ভাঙচুর ও নাশকতা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল হামিদের প্রতি ক্ষোভের কথা বললেও তার বাড়িতে হামলা না করার আহ্বান জানান এবং প্রকাশ্যে তাকে ক্ষমা করে দেওয়ার ঘোষণা দেন।

এই অবস্থান তার রাজনৈতিক চরিত্রের দুই দিক দেখায়। তিনি একদিকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ করেন, অন্যদিকে সেই প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা না করার নির্দেশ দেন। সমর্থকেরা এটিকে রাজনৈতিক সংযম বলেন। সমালোচকেরা মনে করেন, কাউকে ‘ক্ষমা করে দেওয়ার’ ভাষা ব্যবহার করে তিনি নিজেকে বিচারকের অবস্থানে তুলে ধরেছিলেন।

জুলাই আন্দোলন নিয়ে যে বক্তব্যে বিতর্ক

২০২৪ সালের আন্দোলনের পর ফজলুর রহমানের সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় আন্দোলনের কৃতিত্ব ও রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে বিএনপি, আর শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যায়ে এসে আন্দোলনের ফল ঘরে তুলেছে। তিনি জামায়াত-শিবিরকে ‘কালো শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং অভিযোগ করেন, তারা আন্দোলনের কৃতিত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে। 

তার কিছু বক্তব্যকে বিএনপি ‘কুরুচিপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর ও দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০২৫ সালের আগস্টে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। লিখিত জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তার প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সব পদ তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। দল অবশ্য তার মুক্তিযুদ্ধের অবদান বিবেচনায় আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

ফজলুর রহমান জবাবে বলেন, তিনি পুরো জুলাই আন্দোলনকে অস্বীকার করেননি; বরং আন্দোলনের কৃতিত্ব এককভাবে কোনো সংগঠন নিয়ে নেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। তিনি ভুল বক্তব্য প্রমাণিত হলে দুঃখ প্রকাশের কথাও জানান।

বিতর্কের মূল জায়গাটি এখানেই। তার সমর্থকেরা মনে করেন, তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষার জন্য কথা বলেছেন। সমালোচকেরা মনে করেন, এ কাজ করতে গিয়ে তিনি জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের স্বতন্ত্র ভূমিকাকে ছোট করেছেন। একই বক্তব্য তাই একটি অংশের কাছে সাহসী অবস্থান এবং অন্য অংশের কাছে অসম্মানজনক হিসেবে বিবেচিত হয়।

‘ফজু পাগলা’ নামটি যেভাবে রাজনৈতিক পরিচয় হলো

ফজলুর রহমানের সরাসরি কথা বলার ধরন, আঞ্চলিক উচ্চারণ, হাত নেড়ে বক্তৃতা এবং আবেগের মুহূর্তে কঠোর শব্দ ব্যবহারের কারণে তার বক্তব্যের ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধীরা তাকে ব্যঙ্গ করে ‘ফজু পাগলা’ বলতে শুরু করে। 

প্রথম দিকে তিনি এই নামের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি জানালেও পরে কৌশল বদলান। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের উদাহরণ দিয়ে নামটিকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করেন। যারা নামটি দিয়েছেন, তাদের ধন্যবাদও জানান।

রাজনৈতিক যোগাযোগের দিক থেকে এটি ছিল কার্যকর কৌশল। বিদ্রূপকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলে সেটি আরও আঘাতের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারত। তিনি বরং নামটিকে নিজের করে নিয়ে বিরোধীদের আক্রমণের ধার কমিয়ে দেন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে তার পরিচিতিও বেড়ে যায়।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—‘ফজু পাগলা’ তার আনুষ্ঠানিক বা সম্মানসূচক নাম নয়। শব্দটি প্রথমে রাজনৈতিক বিদ্রূপ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে নামটি ব্যবহারের সময় উদ্ধৃতি চিহ্ন রাখা এবং এর পেছনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা পেশাদার সাংবাদিকতার অংশ।

সংসদে আলোচিত বক্তব্য

২০২৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও ফজলুর রহমান তার স্বভাবসুলভ বক্তৃতা অব্যাহত রাখেন। সংসদে মুক্তিযুদ্ধ, জামায়াতে ইসলামী ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের সদস্য জামায়াতের রাজনীতি করতে পারেন না। তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, ফজলুর রহমান তার পারিবারিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের একদল সদস্যও ফজলুর রহমানের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। তাদের যুক্তি ছিল, মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন; ফলে কোনো একটি দলের সদস্য হওয়ার কারণে কারও মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় অস্বীকার করা ঠিক নয়।

এই বিতর্ক ফজলুর রহমানের রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রধান দুর্বলতা সামনে আনে। তিনি ইতিহাস ও আদর্শের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নিতে চান, কিন্তু অনেক সময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা সার্বিক মন্তব্য করে ফেলেন। এতে মূল বক্তব্যের বদলে শব্দচয়নই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

এলাকার মানুষের কাছে তিনি কেমন

ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে ফজলুর রহমানের শক্তিশালী ব্যক্তিগত সমর্থন রয়েছে—২০২৬ সালের নির্বাচনের ফল তার সবচেয়ে বড় পরিমাপ। তিনি তিন উপজেলাতেই নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। স্থানীয় পর্যায়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার প্রচলিত স্বীকৃতি, বক্তৃতার ধরন এবং আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থান জনপ্রিয়তার পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালে বিএনপি তাকে মনোনয়ন দেওয়ার পর ইটনায় সমর্থকেরা আনন্দমিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেন। স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলেন, তার মনোনয়নে হাওরের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। দলীয় পদ স্থগিত হওয়ার পরও স্থানীয় অনুসারীরা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছিলেন।

তবে এলাকার সবাই তার সমর্থক—এমন দাবি করা যাবে না। বিএনপির ভেতরেই একাধিক নেতা তার বিপরীতে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রবীণ নেতাদের প্রভাবের কারণে অনেক স্থানীয় কর্মী মূল্যায়িত হননি। জামায়াতেরও সংগঠিত ভোট ও সমর্থন রয়েছে। নির্বাচনে ফজলুর রহমান বড় ব্যবধানে জিতলেও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সাংগঠনিক বিভাজন পুরোপুরি শেষ হয়নি।

দেশবাসীর কাছে তার ভাবমূর্তি

জাতীয় পর্যায়ে ফজলুর রহমানের ভাবমূর্তি দ্বিমুখী। একদল মানুষ তাকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আপসহীন, স্পষ্টভাষী ও নির্ভীক রাজনীতিক হিসেবে দেখেন। বিশেষ করে জামায়াতের ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে তার কঠোর অবস্থান এবং আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী অনিয়মের সমালোচনা তাকে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার কিছু মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য করেছে।

অন্যদিকে একটি বড় অংশ তাকে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ ও অসংযত বক্তা হিসেবে দেখে। তাদের মতে, তিনি যুক্তিসংগত রাজনৈতিক বক্তব্য শুরু করলেও অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রমণ, সাধারণীকরণ বা কঠোর শব্দের কারণে বিতর্ক তৈরি করেন। বিএনপির শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা এই সমালোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

তার জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ হলো ভাষা। তিনি পরিশীলিত রাজনৈতিক শব্দের বদলে গল্প, উপমা, গ্রামীণ উদাহরণ ও কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক টান ব্যবহার করেন। এতে তার বক্তব্য সহজেই ছোট ভিডিওতে রূপ নেয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু একই বৈশিষ্ট্য কখনো কখনো তাকে রাজনৈতিক ট্রলের লক্ষ্যও বানায়।

৪০ বছর পর সংসদে প্রত্যাবর্তন

১৯৮৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার প্রায় ৪০ বছর পর ২০২৬ সালে আবার সংসদে ফেরেন ফজলুর রহমান। মাঝে তিনি কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জয় পাননি। এত দীর্ঘ বিরতির পর সংসদে ফেরা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে বিরল ঘটনা।

জয় পাওয়ার পর তিনি বলেন, শেষ বয়সে এলাকার মানুষ তাকে যে সম্মান দেখিয়েছেন, তা রক্ষার চেষ্টা করবেন। নির্বাচনী ফলকে শুধু দলীয় ভোটের জয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় পরিচয়, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উপস্থিতি, ব্যক্তিগত সহানুভূতি এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তার দৃশ্যমান অবস্থান। বর্তমান জীবন ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার

বর্তমানে ফজলুর রহমানের প্রধান পরিচয় কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য। সংসদে তিনি শুধু জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, হাওরের উন্নয়ন নিয়েও কথা বলছেন। ২০২৬ সালের জুনে বাজেট আলোচনায় তিনি হাওর অঞ্চলের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানান। তার মতে, হাওরের কৃষি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সমস্যা আলাদা হওয়ায় একটি বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন। 

একই আলোচনায় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বাড়ানোর দাবি তোলেন। ভাতা অন্তত প্রতীকী পরিমাণে হলেও বাড়ানো উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তার সামনে এখন বড় পরীক্ষা হলো, আলোচিত বক্তার পরিচয় ছাড়িয়ে কার্যকর সংসদ সদস্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা, স্থায়ী যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম এবং বর্ষাকালে নিরাপদ জীবন চান। জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কে তিনি যতটা সময় দেন, নির্বাচনী এলাকার বাস্তব সমস্যায় কতটা ফল আনতে পারবেন—শেষ পর্যন্ত তার বর্তমান রাজনৈতিক অধ্যায়ের মূল্যায়ন সেখানেই হবে।

এক ব্যক্তির মধ্যে বাংলাদেশের তিন রাজনৈতিক যুগ

ফজলুর রহমানের জীবনকে আলাদা করে তুলেছে তার রাজনৈতিক সময়কাল। তিনি পাকিস্তান আমলের ছাত্ররাজনীতি দেখেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সামরিক শাসনের সময় নির্বাচন করেছেন, নতুন দলে যোগ দিয়েছেন, বিএনপির বিরোধী রাজনীতি করেছেন এবং ডিজিটাল যুগের ভাইরাল বক্তায় পরিণত হয়েছেন।

তার মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতির তিনটি যুগ একসঙ্গে দেখা যায়। প্রথমটি স্বাধীনতার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের আবেগ। দ্বিতীয়টি দলীয় ভাঙন, নির্বাচন ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। তৃতীয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ, যেখানে একটি বক্তব্য কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং একটি বিদ্রূপাত্মক নামও রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত হতে পারে।

এই দীর্ঘ পথচলাই তাকে সাধারণ কোনো দলীয় নেতার চেয়ে আলাদা করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এত বছরের রাজনীতি তাকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখেনি। দলবদল, কঠোর বক্তব্য, জুলাই আন্দোলন নিয়ে মূল্যায়ন, আদালত সম্পর্কে মন্তব্য এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণের ভাষা তার জীবনীতে প্রশ্নের জায়গা তৈরি করেছে।

উপসংহার

মো. ফজলুর রহমান একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী প্রবীণ রাজনীতিক, আইনজীবী, সাবেক ছাত্রনেতা, দলবদলের অভিজ্ঞ চরিত্র, জনপ্রিয় বক্তা এবং বিতর্কিত সংসদ সদস্য। তার জীবন বাংলাদেশের গত ছয় দশকের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।

সমর্থকদের কাছে তিনি অন্যায়ের সামনে আপস না করা হাওরের সাহসী সন্তান। সমালোচকদের কাছে তিনি আবেগে নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করা একজন প্রবীণ নেতা। দুই মূল্যায়নের মধ্যেই কিছু বাস্তবতা রয়েছে।

‘ফজু পাগলা’ নামটি তাকে দেশজুড়ে পরিচিত করেছে, কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় এটি নয়। তার রাজনৈতিক গুরুত্ব তৈরি হয়েছে দীর্ঘ পথচলা, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার দাবি, ছাত্ররাজনীতি, আইন পেশা, নির্বাচনী সংগ্রাম এবং প্রায় ৪০ বছর পর সংসদে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে।

তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ মূল্যায়ন নির্ধারিত হবে তিনি কতটা জোরে কথা বলেন, তার ওপর নয়। বরং নির্ভর করবে সংসদে কতটা দায়িত্বশীল থাকেন, বিতর্কের মধ্যে ভাষার সংযম কতটা বজায় রাখেন এবং হাওরের মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেন কি না—তার ওপর।

বিজ্ঞাপন