• বৃহস্পতিবার , ০২ জুলাই, ২০২৬ | ১৮ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমান: পিতার আদর্শ, মায়ের সংগ্রাম ও নিজের রাজনৈতিক যাত্রা

তারেক রহমান: পিতার আদর্শ, মায়ের সংগ্রাম ও নিজের রাজনৈতিক যাত্রা

Tariq Rahman: Father's ideal, mother's struggle and own political journey

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬:০০ ২ জুলাই ২০২৬

তারেক রহমান বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি দেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা ও মানুষের অধিকার নিয়ে বিশেষ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। দীর্ঘ নির্বাসন, মামলা, রাজনৈতিক চাপ এবং পারিবারিক কষ্ট পেরিয়ে তিনি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ফিরে আসেন।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

তারেক রহমান ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক পরিবার জিয়া পরিবারের সন্তান। তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনানী, সাবেক সেনাপ্রধান এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তার মা বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন। এমন পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে রাজনীতি তার জীবনের সঙ্গে খুব ছোটবেলা থেকেই যুক্ত হয়ে যায়।

শৈশব ও বেড়ে ওঠা

তারেক রহমানের শৈশব ছিল সাধারণ কোনো শিশুর মতো শান্ত ও সহজ নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি খুব ছোট ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে তিনিও যুদ্ধকালীন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। পরে ১৯৮১ সালে তার পিতা জিয়াউর রহমান নিহত হন, যা তার জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে আসে। অল্প বয়সেই তিনি বুঝতে শেখেন ক্ষমতা, রাষ্ট্র, ত্যাগ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের কঠিন বাস্তবতা।

শিক্ষাজীবন

তারেক রহমান ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, গণতন্ত্র, সমাজ ও মানুষের অধিকার নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এই শিক্ষাজীবন তার রাজনৈতিক চিন্তা ও নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করে।

বাবার আদর্শ ও রাজনৈতিক শিক্ষা

তারেক রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের বড় উৎস তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী চিন্তা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং সাধারণ মানুষের উন্নয়নের ধারণা তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থানে গভীর প্রভাব ফেলে। সমর্থকদের চোখে তিনি তার বাবার আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

রাজনীতিতে প্রবেশ

তারেক রহমান ধীরে ধীরে বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান এবং দলকে তৃণমূল থেকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। পরে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

কেন দেশ ছাড়তে হয়েছিল

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন। বিএনপির দাবি, সে সময় তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে ২০০৮ সালে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে যান। বিরোধীরা বিষয়টিকে রাজনৈতিক মামলা ও পলাতক অবস্থান হিসেবে দেখালেও বিএনপি ও তার সমর্থকদের মতে, এটি ছিল চিকিৎসা, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে বাঁচার একটি কঠিন বাস্তবতা।

লন্ডনে অবস্থান ও রাজনৈতিক ভূমিকা

লন্ডনে থাকলেও তারেক রহমান রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাননি। তিনি প্রবাসে থেকে বিএনপির সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা, রাজনৈতিক কৌশল এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন। বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। দূর থেকে দল পরিচালনা, নেতাকর্মীদের ঐক্য ধরে রাখা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বার্তা দেওয়া তার লন্ডন জীবনের বড় অংশ ছিল।

বাংলাদেশের মানুষের জন্য চিন্তা

তারেক রহমান তার বক্তব্যে বারবার বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক, নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ার কথা বলেছেন। তার রাজনৈতিক ভাষণে মানুষের ভোটাধিকার, নাগরিক নিরাপত্তা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ এবং শান্তির কথা গুরুত্ব পায়। সমর্থকদের কাছে তিনি এমন একজন নেতা, যিনি দূরে থেকেও দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেছেন।

আওয়ামী লীগ আমলে ভূমিকা

আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে তারেক রহমান বিএনপির অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রীয় অবস্থানে ছিলেন। দলীয়ভাবে তিনি ভোটাধিকার, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। এই সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও রায় ছিল, যেগুলোকে বিএনপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে। পরবর্তীতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তিনি খালাস পান বলেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

মায়ের মৃত্যু ও দেশে ফিরে আসা

দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় বিদেশে থাকার পর তারেক রহমান বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার সময় তার সমর্থকদের মধ্যে আবেগ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। কিছুদিন পর তার মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু তার জীবনে আরেকটি গভীর ব্যক্তিগত শোক নিয়ে আসে। মায়ের মৃত্যু, দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা এবং দলীয় নেতৃত্ব গ্রহণ—সব মিলিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের এই অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়

বর্তমানে তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত। তিনি জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন এবং বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সমর্থকদের কাছে তিনি দীর্ঘ সংগ্রাম, ধৈর্য, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং দেশে ফেরার প্রতীক। তার বর্তমান লক্ষ্য হিসেবে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের অধিকারকে সামনে আনা হয়।

সারাংশ

তারেক রহমানের জীবন রাজনীতি, পরিবার, সংগ্রাম, নির্বাসন এবং প্রত্যাবর্তনের এক দীর্ঘ গল্প। শৈশব থেকেই তিনি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। পিতার আদর্শ, মায়ের নেতৃত্ব, নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘ লন্ডনজীবন তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তার সমর্থকদের চোখে তিনি একজন সাহসী নেতা, যিনি কঠিন সময় পেরিয়ে আবার দেশের রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন।

উপসংহার

তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি আলোচিত অধ্যায়। তার জীবনে আছে পিতার আদর্শ, মায়ের সংগ্রাম, নিজের নির্বাসন, মামলা, রাজনৈতিক চাপ এবং দেশে ফেরার আবেগময় অধ্যায়। সমর্থকদের কাছে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং একজন প্রত্যাবর্তনের প্রতীক—যিনি বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আশার কথা বলতে চান।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/