রবিবার , ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১৯ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রকাশিত: ০৭:৩২ ২৩ অক্টোবর ২০২৫
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে ৩৬ দফা প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ড. মঈন খান বলেন, “আমরা আশা করি, আগামী নির্বাচন একটি উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে যেসব শঙ্কা রয়েছে, তা দূর হয়ে যাবে।” তিনি আরও বলেন, “বিগত তিনটি নির্বাচন ছিল প্রহসনমূলক। আমরা কমিশনকে সতর্ক করেছি যাতে বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে সচেতন থাকে।”
প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে আরও উপস্থিত ছিলেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিব ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া।
বিএনপির প্রস্তাবনাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, অবাধ ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং নির্বাচনকালীন সময়ের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি। প্রস্তাবগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো—
১. নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার: বিএনপি দাবি করেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও ইসিকে শতভাগ নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
২. প্রশাসনিক পুনর্গঠন: মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা—ডিসি, ইউএনও, এসপি, ওসি—দের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক ভারসাম্য আনতে হবে।
৩. বিতর্কিত কর্মকর্তা অপসারণ: পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে জড়িত বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
৪. রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ: প্রশাসনের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
৫. নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা: ভোটের এক সপ্তাহ আগে থেকে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন নিশ্চিত করতে হবে।
৬. নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ: কমিশনের কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে তারা আইনশৃঙ্খলা ও আচরণবিধি লঙ্ঘন দ্রুত মোকাবিলা করতে পারেন।
৭. সিসি ক্যামেরা স্থাপন: ভোটকেন্দ্রের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণযোগ্য করতে সিসি ক্যামেরা বসানোর দাবি জানানো হয়।
৮. অভিযোগ নিষ্পত্তি কেন্দ্র: জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘Complain Redress Centre’ স্থাপন করে ১২ ঘণ্টার মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রস্তাব করা হয়।
৯. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি নির্বাচন স্থগিত: জাতীয় নির্বাচনের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি নির্বাচনের নির্দেশনা বাতিল করতে হবে।
১০. দলীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিয়োগ নয়: ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ব্যাংক, ইবনে সিনা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের পোলিং কর্মকর্তা করা যাবে না।
১১. মিথ্যা মামলার প্রত্যাহার: রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা নির্বাচন তফসিল ঘোষণার আগেই প্রত্যাহার করতে হবে।
১২. অস্ত্র জমা: আগের সরকারের আমলে বিতরণকৃত অস্ত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে জমা দিতে হবে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।
১৩. অর্থশক্তি নিয়ন্ত্রণ: অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানায় বিএনপি।
১৪. নির্বাচনী সহিংসতা দমন: ভোটকেন্দ্রের আশপাশে যেকোনো সহিংসতা তাৎক্ষণিকভাবে দমন করতে হবে।
১৫. ভোট গণনার স্বচ্ছতা: প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেই ভোট গণনা শেষে তাৎক্ষণিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করতে হবে।
১৬. প্রবাসী ভোটারদের অধিকার: পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা নিতে হবে।
এছাড়া, বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে সংবিধান ও আইনের প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগে “নির্ভীক” থাকার আহ্বান জানায়। দলটি বলে, নির্বাচন কেবল অবাধ ও নিরপেক্ষ হলেই হবে না, বরং তা জনগণের কাছে দৃশ্যমানভাবে নিরপেক্ষ হতে হবে।
তবে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. আবদুল মঈন খান বলেন, “আমরা কোনো লিখিত প্রস্তাব দিইনি।” যদিও তার হাতে ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে করণীয় প্রস্তাবসমূহ’ শীর্ষক একটি লিখিত দলিল দেখা যায়, যা থেকে বোঝা যায় বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসিকে এসব প্রস্তাব হস্তান্তর করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই ৩৬ দফা প্রস্তাব মূলত আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একটি “নিরপেক্ষ নির্বাচন রূপরেখা”, যা বাস্তবায়িত হলে নির্বাচনের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে।
