• শনিবার , ২৯ আগস্ট, ২০২৬ | ১৪ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শত শত বই ও পাঠ্যক্রম নিষিদ্ধ করল তালেবান: রক্ষা পেল না ইসলামি চিন্তাবিদদের বইও

শত শত বই ও পাঠ্যক্রম নিষিদ্ধ করল তালেবান: রক্ষা পেল না ইসলামি চিন্তাবিদদের বইও

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩:৩১ ১ অক্টোবর ২০২৫

আফগানিস্তানে তালেবান শাসন শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। ইসলামি শরিয়াহ ও আফগান মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অজুহাতে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থাগারে শত শত বই ও পাঠ্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে একদিকে স্পষ্ট হচ্ছে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বার্তা, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রকাশনা শিল্পে বড় সংকট।

বই নিষিদ্ধের পটভূমি

২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ শুরু করে তালেবান। ২০২৪ সালে কাবুলের গ্রন্থাগারে প্রকাশিত তালিকায় প্রথমবারের মতো ৪০০ বই নিষিদ্ধ করা হয়, যেখানে গণতন্ত্র, নারী অধিকার, শিয়া মতবাদ ও প্রতিরোধ নেতা আহমদ শাহ মাসুদের জীবনী অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ধর্মীয় নির্দেশনা, হজ ও ধর্মবিষয়ক, তথ্য ও সংস্কৃতি এবং উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ বৈঠকে বই নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। তালেবান সর্বোচ্চ নেতা মোল্লা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নির্দেশে গঠিত হয় ১৪ সদস্যের একটি কমিটি, যারা দেশব্যাপী বই পর্যালোচনার দায়িত্বে থাকে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী নূর মোহাম্মদ সাকিব বলেন, “ইসলাম ও আফগান মূল্যবোধের বিরোধী সব বই সরিয়ে ফেলার জন্যই এই উদ্যোগ।”

নিষিদ্ধ পাঠ্যবিষয়

তালেবান সরকারের ঘোষণায় ১৮টি পাঠ্যবিষয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলন

আফগানিস্তানের সাংবিধানিক আইন

ধর্মের ইতিহাস

নারীর সমাজবিজ্ঞান

জনসংযোগে নারীর ভূমিকা

সুশাসন ও নির্বাচনীব্যবস্থা

লিঙ্গ ও উন্নয়ন

মানবাধিকার ও গণতন্ত্র

বিশ্বায়ন ও নৈতিক দর্শন

এসব বিষয় আগে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদে বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হতো।

ইসলামি চিন্তাবিদদের বইও নিষিদ্ধ

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, প্রভাবশালী অনেক ইসলামি চিন্তাবিদের বই নিষিদ্ধ তালিকায় পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর কোরআন কি চার বনিয়াদি ইসতিলাহি

সাইয়েদ কুতুবের সোশ্যাল জাস্টিস ইন ইসলাম

মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব নজদির কিতাব আত-তাওহিদ

জামালউদ্দীন আফগানির সংস্কার বিষয়ক রচনা

আবদুল্লাহ আজ্জাম, ইউসুফ আল-কারযাভি ও আলী শরিয়াতির লেখা

এ ছাড়া আফগান লেখক নাসরুল্লাহ স্তানকজাই, জাকিয়া আদেলি, আবদুর রহমান সেলিমসহ অনেকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছেন।

পশ্চিমা সাহিত্যও বাদ

তালেবান পশ্চিমা বহু জনপ্রিয় রচনাও নিষিদ্ধ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

ইউভাল নোয়া হারারির স্যাপিয়েন্স

দান্তের ডিভাইন কমেডি

কাহলিল জিবরানের দ্য প্রফেট

ব্রুস জে কোহেনের ইন্ট্রোডাকশন টু সোশিওলজি

জর্জ রিৎজারের কনটেম্পোরারি সোশিওলজিক্যাল থিওরি

ইরানি লেখকদের ওপর আলাদা নজর

প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, প্রায় ৩১০টি ইরানি লেখকের বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তালেবান কর্তৃপক্ষ এগুলোকে শিয়া মতাদর্শ-সম্পর্কিত বলে দাবি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সঙ্গে পানিবণ্টন ও শরণার্থী ইস্যুতে উত্তেজনা থাকায় রাজনৈতিক কারণেও এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা ও প্রকাশনা শিল্পে প্রভাব

এই নিষেধাজ্ঞা আফগানিস্তানের শিক্ষা খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিকল্প পাঠ্যবই এখনো তৈরি হয়নি, ফলে পড়াশোনা ও পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। কাবুলের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক জ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।”

এছাড়া প্রকাশনা শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সীমান্তে ইরান থেকে আনা বই প্রায়ই আটকে দেওয়া হচ্ছে।

তালেবানের বার্তা

তালেবান কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তাদের লক্ষ্য হলো “শরিয়াহনির্ভর শিক্ষা” বিস্তৃত করা। বিশ্লেষকদের মতে, এ পদক্ষেপ কেবল শিক্ষানীতি নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। তারা বিশ্বকে জানাতে চাইছে, আফগানিস্তানে কেবল তাদের ব্যাখ্যাকৃত ইসলামি কাঠামোই কার্যকর হবে।

বিজ্ঞাপন