• সোমবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৬ | ১৬ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘এশিয়ার নোবেল’জয়ী রুনা খান সংগ্রাম থেকে বিশ্বজয়ের গল্প

‘এশিয়ার নোবেল’জয়ী রুনা খান সংগ্রাম থেকে বিশ্বজয়ের গল্প

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৩৬ ৩১ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা সমাজ উদ্যোক্তা রুনা খান ২০২৬ সালের র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেয়েছেন। প্রান্তিক, নদীভাঙনপ্রবণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কয়েক দশকের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।

রুনা খান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের দুর্গম চর, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জীবিকা উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে আসছে।

২০২৬ সালের র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের জন্য রুনা খানের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের কূটনীতিক ও আইনজ্ঞ টমি কোহ এবং মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী বো চিও নির্বাচিত হয়েছেন। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান আগামী ১৫ নভেম্বর ফিলিপাইনের ম্যানিলার মেট্রোপলিটন থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

রুনা খান কে?

রুনা খান বাংলাদেশের একজন সমাজ উদ্যোক্তা, উন্নয়নকর্মী ও মানবিক উদ্যোগের অন্যতম পরিচিত মুখ। তিনি ২০০২ সালে ফ্রেন্ডশিপ প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির মাধ্যমে দেশের এমন সব জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, যাদের কাছে প্রচলিত ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও উন্নয়নের সুযোগ পৌঁছানো কঠিন।

দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জীবন বাস্তবতা, নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে তাঁর উন্নয়ন ভাবনা গড়ে ওঠে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

রুনা খান ১৯৫৮ সালের ১৭ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে একটি সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় পরিবেশে। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ধরনের চিন্তাবিদ, শিল্পী ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর পরিবারের যোগাযোগ ছিল বলে তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি ফার্মভিউ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং পরে মুরির সেন্ট ডেনিস হাই স্কুলে পড়েন। উচ্চশিক্ষায় তিনি কলকাতার লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ থেকে ভূগোলে অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ থেকেও মানবিক বিষয়ে দ্বিতীয় ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন।

তবে তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তৈরি হয় প্রথাগত পেশার বাইরে গিয়ে মানুষের জন্য কাজ করার মধ্য দিয়ে।

শিক্ষা ও সামাজিক কাজের প্রতি আগ্রহ

রুনা খানের কর্মজীবনের শুরু থেকেই শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে আগ্রহ ছিল। শিশুদের শিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি এমন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন, যেখানে মানুষের নিজস্ব সক্ষমতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি উপলব্ধি করেন, বাংলাদেশের দুর্গম ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার মানুষের সমস্যা শুধু একটি নির্দিষ্ট খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

স্বাস্থ্যসেবা না থাকলে মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়, শিক্ষা না থাকলে নতুন প্রজন্ম পিছিয়ে পড়ে, আর জীবিকার সুযোগ না থাকলে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমন্বিত চিন্তাই পরবর্তীতে ফ্রেন্ডশিপের কাজের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

ফ্রেন্ডশিপ প্রতিষ্ঠার গল্প

২০০২ সালে রুনা খান ফ্রেন্ডশিপ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটির শুরু হয়েছিল দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। ফ্রেন্ডশিপের প্রথম দিকের অন্যতম উদ্যোগ ছিল একটি ভাসমান হাসপাতাল, যার মাধ্যমে যমুনা নদীর চরাঞ্চলে বসবাসকারী সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া হতো।

নদীর গতিপথ পরিবর্তন, চর জেগে ওঠা ও বিলীন হওয়া এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এসব অঞ্চলের মানুষের কাছে স্থায়ী হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবা পাওয়া কঠিন।

এই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে ভাসমান হাসপাতালের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ভাসমান হাসপাতালের অভিনব উদ্যোগ

ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান হাসপাতাল রুনা খানের সবচেয়ে পরিচিত উদ্যোগগুলোর একটি। নদীপথে চলাচল করতে পারে এমন হাসপাতালের মাধ্যমে দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া হয়।

যেখানে স্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ করা কঠিন, সেখানে নৌযানকে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা একটি কার্যকর বিকল্প তৈরি করে।

এই উদ্যোগ শুধু বাংলাদেশের মানুষের কাছে নয়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অঙ্গনেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ফ্রেন্ডশিপের কাজ ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যসেবা থেকে শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়।

দুর্গম মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা

বাংলাদেশের নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। নদীভাঙনের কারণে অনেক পরিবারকে বারবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগও সীমিত।

ফ্রেন্ডশিপ এই জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ভাসমান হাসপাতাল, মোবাইল মেডিকেল সেবা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য উদ্যোগ পরিচালনা করেছে।

রুনা খানের উন্নয়ন দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যে মানুষদের কাছে সেবা পৌঁছানো সবচেয়ে কঠিন, তাদের কাছেই আগে পৌঁছাতে হবে।

শিক্ষা নিয়ে রুনা খানের কাজ

স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা ফ্রেন্ডশিপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। নদীভাঙনের কারণে যেসব পরিবারকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে হয়, তাদের শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এই সমস্যা মোকাবিলায় ফ্রেন্ডশিপ এমন স্কুল ও শিক্ষা উদ্যোগ তৈরি করেছে, যা স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়।

কিছু ক্ষেত্রে চলনসই বা স্থানান্তরযোগ্য স্কুলের মাধ্যমে নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বিভিন্ন সমস্যা দেশের লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকায় প্রভাব ফেলছে।

রুনা খান ও ফ্রেন্ডশিপের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো উন্নয়নকে জলবায়ু অভিযোজনের সঙ্গে যুক্ত করা।

দুর্যোগ মোকাবিলা থেকে শুরু করে জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে আরও সক্ষম করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ফ্রেন্ডশিপ

বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙন নিয়মিত দুর্যোগের সৃষ্টি করে। এসব দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

ফ্রেন্ডশিপ দুর্যোগের সময় জরুরি সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও সক্ষমতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের মধ্যে দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু সহনশীলতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা

রুনা খানের উন্নয়ন দর্শনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফ্রেন্ডশিপের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন, জীবিকা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

রুনা খানের প্রতিষ্ঠিত আরেকটি উদ্যোগ ‘Friendship Colours of the Chars’ চরাঞ্চলের নারীদের তৈরি পণ্যকে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করে।

দারিদ্র্য বিমোচন ও জীবিকা উন্নয়ন

দারিদ্র্য দূর করার জন্য শুধু আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়—মানুষকে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। রুনা খানের উন্নয়ন মডেলে এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রেন্ডশিপ স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জীবিকা তৈরির ওপর কাজ করে। এর লক্ষ্য হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সক্ষমতা দেওয়া।

ফ্রেন্ডশিপের কাজের বিস্তার

২০০২ সালে একটি ভাসমান হাসপাতাল দিয়ে যাত্রা শুরু করা ফ্রেন্ডশিপ সময়ের সঙ্গে বহুমাত্রিক উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাজের ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, নাগরিক অধিকার এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ।

ফ্রেন্ডশিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন সেবা বছরে ৭৫ লাখের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

রুনা খানের কাজ শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে।

তিনি ২০০৬ সালে Rolex Award for Enterprise, ২০০৮ সালে IDB Prize for Women's Contribution to Development এবং ২০১২ সালে Schwab Foundation Social Entrepreneur Award লাভ করেন। ২০১৬ সালে তিনি Green Award by Positive Planet-ও পান।

এসব পুরস্কার তাঁর সামাজিক উদ্যোগ, উদ্ভাবনী উন্নয়ন মডেল এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির উদাহরণ।

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার কী?

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার এশিয়ার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। অনেক সময় এটিকে ‘এশিয়ার নোবেল’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট র‍্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের নামে এই পুরস্কার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে প্রথমবার এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

এশিয়ার মানুষের জন্য অসাধারণ নেতৃত্ব, মানবসেবা, সামাজিক পরিবর্তন এবং জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের এই পুরস্কারের মাধ্যমে সম্মানিত করা হয়।

কেন র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেলেন রুনা খান?

২০২৬ সালের পুরস্কারের ক্ষেত্রে রুনা খানের কয়েক দশকের কাজ বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

দুর্গম, নদীভাঙনপ্রবণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে তাঁর নেতৃত্ব এবং স্থানীয়ভাবে কার্যকর সমাধান তৈরির প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের মূল্যায়নে মানুষের সেবা করা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য সুযোগ তৈরি করা এবং মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সক্ষমতা দেওয়ার মতো মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রুনা খানের পুরস্কারপ্রাপ্তির গুরুত্ব

রুনা খানের এই অর্জন বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর কাজের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশের এমন জনগোষ্ঠী, যারা সাধারণত দেশের মূল উন্নয়ন ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়।

চরাঞ্চল, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা ও জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার সমন্বিত উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

পুরস্কার পাওয়ার পর রুনা খানের প্রতিক্রিয়া

পুরস্কার পাওয়ার পর রুনা খান এই স্বীকৃতিকে শুধু নিজের অর্জন হিসেবে দেখেননি। তিনি তাঁর সঙ্গে কাজ করা মানুষ এবং ফ্রেন্ডশিপের কর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেছেন, কোনো নেতা একা এগিয়ে যেতে পারেন না; এই স্বীকৃতি সেইসব সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য, যাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল এবং ফ্রেন্ডশিপ পরিবারের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্যও।

এই বক্তব্য তাঁর কাজের মূল দর্শনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ—উন্নয়নকে মানুষের অংশগ্রহণ ও মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা।

২০২৬ সালের অন্য র‍্যামন ম্যাগসাইসাই বিজয়ীরা

২০২৬ সালে রুনা খানের সঙ্গে আরও দুজন ব্যক্তিকে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।

তাঁরা হলেন সিঙ্গাপুরের কূটনীতিক, আইনজ্ঞ ও অধ্যাপক টমি কোহ এবং মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী বো চি

তিনজন ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করলেও মানুষের সেবা, সুযোগ তৈরি এবং মানবিক মূল্যবোধের জায়গায় তাঁদের কাজের মধ্যে মিল রয়েছে।

পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান কবে?

২০২৬ সালের র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক প্রদান অনুষ্ঠান আগামী ১৫ নভেম্বর ২০২৬ ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার মেট্রোপলিটন থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

সেখানে রুনা খানসহ এ বছরের নির্বাচিত বিজয়ীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেওয়া হবে।

রুনা খানের কাজ থেকে যে শিক্ষা

রুনা খানের দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—উন্নয়ন শুধু শহরকেন্দ্রিক অবকাঠামো তৈরি নয়; মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং তাদের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান তৈরি করাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশের চরাঞ্চলের মতো ভৌগোলিকভাবে কঠিন এলাকায় স্থায়ী অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়ে ভাসমান হাসপাতাল, চলনসই শিক্ষা ব্যবস্থা এবং স্থানীয়ভাবে পরিচালিত বিভিন্ন উদ্যোগ তৈরি করা তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের জন্য রুনা খানের অর্জনের তাৎপর্য

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে রুনা খান শুধু ব্যক্তিগতভাবে সম্মানিত হননি; বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক কাজেরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছে।

বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের যে জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাজের স্বীকৃতি পাওয়া দেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

রুনা খানের কাজ দেখিয়েছে, সীমিত সম্পদ ও কঠিন ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যেও স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবনী উদ্যোগ তৈরি করা সম্ভব।

উপসংহার

রুনা খানের জীবন ও কর্মজীবন বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দুর্গম মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ থেকে শুরু করে শিক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জীবিকা উন্নয়ন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মতো বিস্তৃত ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বে ফ্রেন্ডশিপ কাজ করে যাচ্ছে।

২০০২ সালে একটি ভাসমান হাসপাতালের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে একটি বিস্তৃত সামাজিক উন্নয়ন উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।

আর এই দীর্ঘ পথচলার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালে তিনি পেয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার

দুর্গম চরাঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ—রুনা খানের এই যাত্রা বাংলাদেশের উন্নয়নকর্মীদের জন্য যেমন অনুপ্রেরণার, তেমনি জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

বিজ্ঞাপন