• মঙ্গলবার , ২৮ জুলাই, ২০২৬ | ১৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাটার মাস্টার 'দ্য ফিজ'-এর জীবনী ও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

কাটার মাস্টার 'দ্য ফিজ'-এর জীবনী ও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

কাটার মাস্টার 'দ্য ফিজ'-এর জীবনী ও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:৫৫ ২৮ জুলাই ২০২৬

ভূমিকা ও পরিচিতি: বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশ যে কজন অনন্য মেধার বোলারের জন্ম দিয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ও শীর্ষস্থানে রয়েছেন বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। ক্রিকেট বিশ্বে তিনি স্নেহভরে 'দ্য ফিজ' (The Fizz) এবং বৈচিত্র্যময় বোলিংয়ের জন্য 'কাটার মাস্টার' নামে খ্যাত। তাঁর মায়াবী অফ-কাটার (Off-cutter) এবং গতি পরিবর্তনের নিখুঁত দক্ষতা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাটারদেরও বারবার বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। সাতক্ষীরার এক অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে এসে বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজের আধিপত্য বিস্তারকারী এই পেসার বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

জন্ম, শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি: মুস্তাফিজুর রহমান ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আবুল কাশেম গাজী এবং মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে মুস্তাফিজুর সর্বকনিষ্ঠ। ক্রিকেটপ্রেমী পরিবারেই তাঁর শৈশব কেটেছে। শৈশবে গ্রামের মাঠে ভাইদের সাথে টেনিস বলে ক্রিকেট খেলার মাধ্যমেই তাঁর বোলিংয়ের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। পরিবার ও বড় ভাই মখলেছুর রহমানের অনুপ্রেরণাতেই তিনি পেস বোলিংকে নিজের ধ্যাণে পরিণত করেন।

ক্রিকেটে আগমন ও প্রাথমিক দিনগুলো: গ্রামের টেনিস বল ক্রিকেট থেকে পেশাদার ক্রিকেটে পদার্পণ করার যাত্রাটি সহজ ছিল না। প্রতিদিন মোটরসাইকেলে করে বাড়ি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে সাতক্ষীরা জেলা স্টেডিয়ামে অনুশীলনে যেতেন তিনি। ২০১২ সালে খুলনা বিভাগের অধীনে অনূর্ধ্ব-১৭ ক্রিকেটে অসাধারণ পারফর্ম করে তিনি নজর কাড়েন। এরপর তাঁকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (BCB) পেস বোলিং ফাউন্ডেশনের ট্রায়ালে ডাকা হয়, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

অনূর্ধ্ব-১৯ ও ঘরোয়া ক্রিকেটে সাফল্য: ২০১৪ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান মুস্তাফিজুর। সেই টুর্নামেন্টে ৬ ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে তিনি নিজের আগমনী বার্তা দেন। ওই বছরেই খুলনা বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তাঁর। ২০১৪-১৫ মৌসুমে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে চমৎকার লাইন-লেংথ ও সুইং প্রদর্শনের মাধ্যমে ২৬টি উইকেট শিকার করে জাতীয় নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি debut: ২০১৫ সালের ২৪ এপ্রিল মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে মুস্তাফিজুরের অভিষেক ঘটে। প্রথম ম্যাচেই দুর্দান্ত বোলিং করে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানি অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি ও মোহাম্মদ হাফিজের উইকেট শিকার করেন। তাঁর সেই স্পেল দেখেই ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই তরুণের বোলিংয়ে বিশেষ কিছু রয়েছে।

স্বপ্নের ওডিআই অভিষেক ও ভারতের বিরুদ্ধে ইতিহাস সৃষ্টি: ২০১৫ সালের ১৮ জুন ভারতের বিরুদ্ধে ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয় মুস্তাফিজুরের। বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইনআপের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই ৫০ রানে ৫ উইকেট শিকার করে দলকে বিশাল এক জয় এনে দেন তিনি। তবে চমকের তখনো বাকি ছিল! সিরিজের দ্বিতীয় ওডিআইতে তিনি আরও বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে ৪৩ রানে ৬ উইকেট নেন। ওয়ানডে ইতিহাসের প্রথম দুটি ম্যাচে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ১১ উইকেট শিকারের বিশ্বরেকর্ড গড়ে বাংলাদেশকে ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ওডিআই সিরিজ জয় এনে দেন।

টেস্ট ক্রিকেটে পদার্পণ ও প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: ওডিআই ও টি-টোয়েন্টিতে রাজত্ব করার পর ২০১৫ সালের ২১ জুলাই শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্ট ক্যাপ লাভ করেন মুস্তাফিজুর। নিজের অভিষেক টেস্ট ম্যাচেই বল হাতে চমক দেখিয়ে প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট শিকার করে 'প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ' হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। একই বছর সব ফরম্যাটের অভিষেকেই ম্যাচ সেরা হওয়ার বিরল কীর্তি গড়ে তিনি ক্রিকেট বিশ্বে সাড়া ফেলে দেন।

অফ-কাটার ও বৈচিত্র্যময় বোলিং টেকনিক: মুস্তাফিজুর রহমানের মূল শক্তি হলো তাঁর কব্জির নিখুঁত মোচড়ে তৈরি করা অফ-কাটার। একজন বাঁহাতি বোলার হলেও তাঁর বাহু থেকে বেরিয়ে আসা বল ডানহাতি ব্যাটারের জন্য ভেতরের দিকে না ঢুকে বাইরের দিকে কাটে। ব্যাটার যখন মনে করেন বলটি স্বাভাবিক গতির ফাস্ট ডেলিভারি, ঠিক তখনই মুস্তাফিজুর গতি কমিয়ে কাটার মারেন, যা ব্যাটারের ব্যাটের কানায় লেগে ক্যাচে পরিণত হয়। এছাড়া ডেক্সটেরাস স্লোয়ার, ইয়র্কার এবং লাইন-লেংথের ওপর দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণ তাঁকে ডেথ ওভারে বিশ্বের অন্যতম কার্যকর বোলারে পরিণত করেছে।

আইপিএল (IPL) ক্যারিয়ার ও চ্যাম্পিয়ন সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আলোড়ন সৃষ্টি করে ২০১৬ সালের আইপিএল নিলামে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ দলে সুযোগ পান মুস্তাফিজুর। সেই মৌসুমে ১৬ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে সানরাইজার্সকে আইপিএল শিরোপা জেতাতে প্রধান ভূমিকা রাখেন। ১৬তম আইপিএলের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে তিনি 'ইমার্জিং প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট' (Emerging Player of the Year) পুরস্কার জেতেন। পরবর্তীতে তিনি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, দিল্লি ক্যাপিটালস, চেন্নাই সুপার কিংস এবং কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR)-এর মতো বিশ্বসেরা ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোতে খেলেছেন।

বিশ্বের অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে উপস্থিতি: কেবল আইপিএল নয়, বিশ্বের অন্যান্য টি-টোয়েন্টি লিগেও মুস্তাফিজুর একজন চাহিদাসম্পন্ন পেসার। তিনি ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে সাসেক্স (Sussex), পাকিস্তান সুপার লিগে (PSL) লাহোর কালান্দার্স এবং বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (BPL) কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স, ঢাকা ডায়নামাইটস, রংপুর রাইডার্স ও ঢাকা ক্যাপিটালসের হয়ে খেলেছেন। বিপিএলে তিনি ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করা মাত্র চতুর্থ বোলার হিসেবে নাম লেখান।

ইনজুরি ও ফিরে আসার সংগ্রাম: বিশ্বমানের অনেক ফাস্ট বোলারের মতোই ইনজুরি মুস্তাফিজুরের ক্যারিয়ারেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৬ সালে কাউন্টি খেলতে গিয়ে কাঁধের ইনজুরিতে পড়েন এবং অস্ত্রোপচার করাতে হয়। এর ফলে তাঁর বোলিং গতির কিছুটা তারতম্য ঘটে। তবে ইনজুরি কাটিয়ে নিজের কাটার, স্লোয়ার ও বুদ্ধিমত্তাকে অস্ত্র বানিয়ে তিনি দুর্দান্তভাবে বারবার জাতীয় দলে ফিরে এসেছেন।

আইসিসি বিশ্বকাপে পারফরম্যান্স (২০১৯ ও পরবর্তীতে): ২০১৯ সালের আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন টুর্নামেন্টের অন্যতম সফল বোলার। ৮ ম্যাচে ২০ উইকেট নিয়ে তিনি আসরের চতুর্থ সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হন। টুর্নামেন্টে ভারত ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরপর দুই ম্যাচে ৫টি করে উইকেট শিকারের অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। এছাড়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের পেস আক্রমণের মূল কাণ্ডারি হিসেবে ধারাবাহিকভাবে উইকেট শিকার করেছেন।

পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন: ২০১৯ সালের ২২ মার্চ মুস্তাফিজুর রহমান ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর সহধর্মিণী সামিয়া পারভীন মনোভা, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। মুস্তাফিজুর অত্যন্ত শান্ত, লাজুক ও নম্র প্রকৃতির মানুষ হিসেবে পরিচিত। মাঠের বাইরে তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন এড়িয়ে চলেন এবং অবসর সময়ে নিজের গ্রাম সাতক্ষীরাতেই সময় কাটাতে ভালোবাসেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা:

  • আইসিসি উদীয়মান বর্ষসেরা ক্রিকেটার (২০১৫): বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এই স্বীকৃতি পান।
  • আইসিসি ওডিআই টিম অব দ্য ইয়ার (২০১৫ ও ২০২১): বিশ্বসেরা একাদশে স্থান পান।
  • আইপিএল ইমার্জিং প্লেয়ার (২০১৬): একমাত্র বিদেশি ক্রিকেটার হিসেবে সেরা উদীয়মান তারকা নির্বাচিত হন।
  • জাতীয় সম্মাননা: বাংলাদেশের খেলাধুলায় বিশেষ অবদানের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা ও পদক লাভ করেন।

উপসংহার: মুস্তাফিজুর রহমান কেবল একজন ক্রিকেটার নন; তিনি কোটি বাঙালির আবেগ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের এক আলোকবর্তিকা। কাটার এবং বৈচিত্র্যময় বোলিং দিয়ে তিনি যে জাদু দেখিয়েছেন, তা বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নতুন প্রজন্মের উদীয়মান পেসারদের জন্য তাঁর ঘুরে দাঁড়ানো ও দেশপ্রেমের গল্প সবসময় অনুপ্রেরণা জোগাবে।

বিজ্ঞাপন