• সোমবার , ২৭ জুলাই, ২০২৬ | ১২ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোঃ সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু): বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি

মোঃ সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু): বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩:৪৯ ২৭ জুলাই ২০২৬

ভূমিকা ও পরিচিতি: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) স্বাধীন বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি ও প্রশাসনিক ইতিহাসের একজন অন্যতম উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক প্রবীণ ও দক্ষ বিচারক, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক কমিশনার এবং একজন সুপ্রসিদ্ধ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ কয়েক দশকের আইনি, বিচারিক এবং সামাজিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই মানুষটি দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর সর্বোচ্চ অভিভাবক পদে অধিষ্ঠান করে দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় অবদান রেখে চলেছেন। তাঁর জীবন পরিক্রমা কেবল একটি রাজনৈতিক বা পেশাগত ক্যারিয়ারের পথচিত্র নয়; বরং তা বাংলাদেশের অভ্যুদয়, স্বাধীনতার সংগ্রাম, বিচার বিভাগের উন্নয়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত এক ঐতিহাসিক দলিল।

পাবনার শিবরামপুরে জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি: মোঃ সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনা জেলার শিবরামপুর গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী, সম্ভ্রান্ত এবং শিক্ষানুরাগী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম "চুপ্পু", যা স্থানীয়ভাবে এবং রাজনৈতিক মহলে অত্যন্ত স্নেহ ও শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়। তাঁর পিতার নাম শরফুদ্দিন আনছারী এবং মাতার নাম খায়রুন্নেসা। তাঁর পরিবার পাবনা অঞ্চলের সামাজিক ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সুপরিচিত এবং সম্মানিত ছিল। পিতা-মাতার নীতি ও নৈতিকতার শিক্ষায় তিনি শৈশব থেকেই গড়ে ওঠেন। একটি ধর্মীয় ও সুশীল পারিবারিক পরিবেশে বড় হওয়ার কারণে খুব ছোটবেলা থেকেই তাঁর মাঝে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা এবং সমাজসেবামূলক মনোভাব গড়ে উঠেছিল।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন: মোঃ সাহাবুদ্দিনের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল পাবনার স্থানীয় একটি স্কুলে। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি পাবনা শহরের অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান 'রাধানগর মজুমদার একাডেমি'-তে ভর্তি হন। এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয় থেকেই তিনি ১৯৬৬ সালে অত্যন্ত সফলতার সাথে মাধ্যমিক বা এসএসসি (SSC) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মাধ্যমিক স্তরে অধ্যয়নকালেই তাঁর মেধা ও নেতৃত্বের সুপ্ত গুণাবলী শিক্ষকমণ্ডলী ও সহপাঠীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

উচ্চ মাধ্যমিক ও এডওয়ার্ড কলেজে প্রবেশ: মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করার পর তিনি পাবনার স্বনামধন্য ও ঐতিহাসিক সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন। এডওয়ার্ড কলেজ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকেই ১৯৬৮ সালে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি (HSC) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এডওয়ার্ড কলেজের পরিবেশ তাঁর চিন্তাভাবনা ও চেতনার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছিল।

বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ও মনস্তাত্ত্বিক স্নাতকোত্তর অর্জন: এইচএসসি শেষ করে তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজেই বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (B.Sc) শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ১৯৭১ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি তাঁর পড়াশোনার ধারা বজায় রাখেন। স্বাধীনতার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। দেশের অন্যতম সেরা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৭৪ সালে 'মনোবিজ্ঞান' (Psychology) বিষয়ে স্নাতকোত্তর (M.Sc) ডিগ্রি অর্জন করেন। মানবমন ও আচরণের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ সম্পর্কিত এই জ্ঞান তাঁর পরবর্তী বিচারিক ও প্রশাসনিক জীবনে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

আইনবিদ্যায় স্নাতকোত্তর (LL.B) ও পেশাগত প্রস্তুতি: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি গভীর আকর্ষণ থেকে তিনি পরবর্তীতে আইনবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। সেই লক্ষ্যে তিনি পাবনা শহীদ আইন কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৭৫ সালে এলএলবি (LL.B) ডিগ্রি লাভ করেন। আইন বিষয়ে তাঁর এই অগাধ জ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি তাঁর পরবর্তী কর্মজীবনের মূল ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছিল, যা তাঁকে পরবর্তীতে দেশের বিচার বিভাগে একজন নামকরা জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করে।

ছাত্র রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ ও ৬ দফা আন্দোলন: ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন পুরো পূর্ব পাকিস্তান স্বাধিকার ও সায়ত্তশাসনের আন্দোলনে উত্তাল, তখন তরুণ সাহাবুদ্দিন ছাত্র রাজনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ '৬ দফা দাবি' ঘোষণা করলে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে পাবনায় ৬ দফার সমর্থনে জনমত গঠনে মাঠে নামেন। মিছিল, মিটিং ও পোস্টারিংয়ের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষকে বঙ্গবন্ধুর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেন।

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব: ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তৎকালীন আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনের সমর্থনে তিনি পাবনার রাস্তায় মিছিলের নেতৃত্ব দেন। আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে দিতে এবং সাধারণ মানুষকে অধিকার সচেতন করতে তাঁর বক্তৃতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা সেই সময়ে তরুণদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতৃত্ব প্রদান: তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের কারণে ১৯৭২ সালে তিনি পাবনা জেলা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে এবং যুবসমাজকে সুসংগঠিত করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তিনি পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বে থেকে তিনি স্থানীয় যুবসমাজকে দেশ গড়ার কাজে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রাখেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান: মোঃ সাহাবুদ্দিনের জীবনগাথার সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতার ডাক দেন, তখন সাহাবুদ্দিন পাবনা জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে গুরুদায়িত্ব লাভ করেন। তিনি পাবনা অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ করা, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং অস্ত্র সংগ্রহে মূল ভূমিকা পালন করেন।

সশস্ত্র যুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ: ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চের পর পাবনায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল, সাহাবুদ্দিন ছিলেন তার কেন্দ্রবিন্দুতে। পরবর্তীতে তিনি ভারতে গমনাগমন করে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং সরাসরি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানরত বাঙালি শরণার্থী ও তরুণদের সুসংগঠিত করা এবং তাঁদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার কাজ দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করেন। একাত্তরের সেই সংকটময় দিনগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি দেশকে শত্রুমুক্ত করতে লড়াই করেছিলেন, যা তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের একজন সম্মানিত বীর মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদায় ভূষিত করেছে।

১৯৭৫-এর ট্র্যাজেডি ও প্রতিরোধ আন্দোলন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলে সারাদেশের সাথে পাবনাতেও নেমে আসে তীব্র শোক ও হতাশার ছায়া। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে যেসব অল্প কয়েকজন তরুণ নেতা তাৎক্ষণিকভাবে রাজপথে নেমে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ গড়ে তোলার সাহস দেখিয়েছিলেন, মোঃ সাহাবুদ্দিন ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি পাবনায় কালো পতাকা উত্তোলন, মিছিল ও প্রতিরোধ সভা আয়োজন করেন।

সামরিক সরকারের নির্যাতন ও ৩ বছরের কারাবরণ: বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করার অপরাধে তৎকালীন সামরিক স্বৈরাচারী সরকার তাঁকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে তাঁকে অমানুষিক প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর সামরিক বাহিনীর অত্যাচার কেন্দ্রে তাঁকে দীর্ঘদিন মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। পরবর্তীতে তাঁকে কারাগারে পাঠ দেওয়া হয় এবং তিনি টানা প্রায় ৩ বছর কারাবন্দী থাকেন। জেলখানায় বন্দি থেকেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং দেশপ্রেম থেকে একচুলও সরে আসেননি। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবারও সমাজে নিজের অবস্থান পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করেন।

বিসিএস (বিচার) ক্যাডারে যোগদান ও প্রথম পদায়ন: দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্যাতন ও কারাবাস শেষ করে তিনি আইন পেশায় মনোনিবেশ করেন। তবে পরবর্তীতে দেশসেবার সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র হিসেবে তিনি বিচার বিভাগকে বেছে নেন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (BCS) পরীক্ষায় বিচার ক্যাডারে বিপুল কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সহকারী জজ (মুন্সেফ) হিসেবে বিচার বিভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। এর মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি অধ্যায়ের বিরতি ঘটে এবং বিচারক হিসেবে তাঁর জীবনের এক নতুন স্বর্ণালী অধ্যায়ের সূচনা হয়।

বিচারক হিসেবে কর্মজীবনের বিকাশ: বিসিএস বিচারক হিসেবে যোগদানের পর মোঃ সাহাবুদ্দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সততা, নিরপেক্ষতা এবং দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। সহকারী জজ থেকে শুরু করে সিনিয়র সহকারী জজ, সাব-জজ (যুগ্ম জেলা জজ) এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পদে তিনি একে একে পদোন্নতি লাভ করেন। তিনি যেসব আদালতে বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন, সেখানে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং আইনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর ছিলেন। আইনি জটিল ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর সুচিন্তিত রায়গুলো বিচার বিভাগে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।

জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে সুদীর্ঘ অবদান: ১৯৯৫ সালে তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। এরপর থেকে ২০০৬ সালে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জেলায় সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ ২৪ বছরের বিচারিক জীবনে তিনি হাজার হাজার দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি করেছেন। জটিল ও স্পর্শকাতর মামলা সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর ধৈর্য ও মেধা বিচারক সমাজে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। ২০০৬ সালে দীর্ঘ ও সফল বিচারিক ক্যারিয়ার শেষে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে আইন চর্চা: বিচার বিভাগ থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে আইন পেশায় পুনরায় ফিরে আসেন। ২০০৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে দক্ষতার সাথে আইন চর্চা করেন। এছাড়া তিনি বিচারক সমিতির বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সাথে নিজেকে যুক্ত রেখে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় পরামর্শমূলক অবদান অব্যাহত রাখেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে নিয়োগ (২০১১-২০১৬): ২০১১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিচারিক ও আইনি অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ মোঃ সাহাবুদ্দিনকে স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান 'দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)'-এর কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দান করে। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি এই সংস্থায় কমিশনার পদে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্নীতি প্রতিরোধ, দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা আনয়ন এবং দুর্নীতিগ্রস্ত মামলার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে তিনি দৃঢ় পদক্ষেপ নেন।

পদ্মা সেতু বিতর্ক ও ঐতিহাসিক আইনি অবস্থান: দুদক কমিশনার হিসেবে মোঃ সাহাবুদ্দিনের নাম বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পদ্মা সেতু মামলার সময়। আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থা বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু প্রকল্পে কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়, তখন দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিন আন্তর্জাতিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে শক্ত আইনি ও তদন্তমূলক অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি ও তাঁর কমিশন নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে বিশ্বব্যাংকের আনীত দুর্নীতির অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে প্রমাণ করেন। পরবর্তীতে কানাডার আদালতেও দুদকের এই তদন্ত প্রতিবেদন সত্য প্রমাণিত হয় এবং বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ খারিজ হয়ে যায়। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের গৌরব ও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে তাঁর এই সাহসিক সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে পুনরাবর্তন: ২০১৬ সালে দুদকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মোঃ সাহাবুদ্দিন পূর্ণাঙ্গভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূলধারায় প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর দীর্ঘদিনের ত্যাগ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দলের প্রতি আনুগত্য বিবেচনায় এনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম 'উপদেষ্টা পরিষদ'-এর সদস্য হিসেবে মনোনীত করেন।

প্রচার উপকমিটির চেয়ারম্যান ও নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা: পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটির চেয়ারম্যানের গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেন। দলের নীতি ও সরকারের উন্নয়নমূলক কাজগুলো প্রচার করার ক্ষেত্রে তিনি কৌশলগত নেতৃত্ব প্রদান করেন। এছাড়া ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (Election Commissioner) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক নির্বাচন পরিচালনা সম্পন্ন করেন।

বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন (২০২৩): ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষ হতে চললে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন—তা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি হয়। এমন এক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংসদীয় দল সর্বসম্মতিক্রমে মোঃ সাহাবুদ্দিনকে দেশের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। একজন ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সিনিয়র বিচারক এবং রাজনৈতিকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী হওয়ায় তাঁর নাম সর্বস্তরে সমাদৃত হয়।

বিনাপ্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচন ও গেজেট প্রকাশ: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদের জন্য কেবলমাত্র মোঃ সাহাবুদ্দিনের মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তাঁর সকল কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ বলে ঘোষিত হয়। অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ তারিখে মোঃ সাহাবুদ্দিনকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে।

শপথ গ্রহণ ও দায়িত্বভার গ্রহণ: ২৪ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে রাজধানী ঢাকার বঙ্গভবনের ঐতিহাসিক দরবার হলে এক জাকজমকপূর্ণ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করেন। জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদের শপথ ও গোপনীয়তার শপথ পাঠ করান। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি, বিদায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীপরিষদের সদস্য এবং দেশি-বিদেশি কূটনীতিবিদরা উপস্থিত ছিলেন। শপথ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে অধিষ্ঠিত হন।

রাষ্ট্রপতির কার্যকাল ও সাংবিধানিক দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মোঃ সাহাবুদ্দিন দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আচার্য (Chancellor) হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থার তত্ত্বাবধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক (Commander-in-Chief) হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে কাজ করছেন। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনা ও সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে ভূমিকা রাখছেন।

পারিবারিক জীবন ও সহধর্মিণী ড. রেবেকা সুলতানা: ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে মোঃ সাহাবুদ্দিন অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং সুখী। তাঁর সহধর্মিণী ড. রেবেকা সুলতানা বাংলাদেশ সরকারের একজন সাবেক যোগ্য ও দক্ষ যুগ্ম সচিব ছিলেন। চাকরিজীবন শেষে তিনি শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা ও সমাজ উন্নয়নমূলক সংস্থার সাথে জড়িত। রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দীর্ঘ কঠিন যাত্রায় ড. রেবেকা সুলতানা সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণা ও শক্তি হিসেবে পাশে থেকেছেন।

সন্তান ও পারিবারিক পরিচিতি: মোঃ সাহাবুদ্দিন ও ড. রেবেকা সুলতানা দম্পতির একমাত্র পুত্র সন্তান রয়েছেন, যাঁর নাম আরশাদ আদনান (রনি)। আরশাদ আদনান বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও বিনোদন অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং বিশেষ করে ঢালিউড চলচ্চিত্র শিল্পের একজন প্রথম সারির প্রযোজক। বাংলা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক মানের রূপ দিতে এবং আধুনিক চলচ্চিত্র প্রযোজনায় তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে।

মোঃ সাহাবুদ্দিনের জীবনের প্রধান অর্জনসমূহ (এক নজরে): ১. বীর মুক্তিযোদ্ধা: ১৯৭১ সালে পাবনা অঞ্চলে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া। ২. গণআন্দোলনের নেতা: ১৯৬৬-এর ৬ দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭২ সালে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দান। ৩. ৩ বছরের কারাবরণ: ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রাজপথে প্রতিবাদ করায় ৩ বছর সামরিক স্বৈরশাসনের অধীনে জেল খাটেন। ৪. ২৪ বছরের বিচারক জীবন: জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে সুদীর্ঘ ২৪ বছর বিচার বিচার বিভাগে থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। ৫. দুদক কমিশনার: পদ্মা সেতু বিতর্ক ও মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে খণ্ডন করতে আইনি ও তদন্তমূলক ভূমিকা। ৬. ২২তম রাষ্ট্রপ্রধান: ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া।

ব্যক্তিত্ব ও মানবিক বৈশিষ্ট্য: মোঃ সাহাবুদ্দিন ব্যক্তিত্বের দিক থেকে অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী, মার্জিত এবং স্পষ্টভাষী একজন মানুষ। হাজারও রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সবসময় সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এসেছেন। বই পড়া, পড়াশোনা করা এবং দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করা তাঁর অন্যতম প্রিয় কাজ। বিচারকের আসনে যেমন তিনি কঠোর ও নিরপেক্ষ ছিলেন, তেমনি ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ও পরোপকারী মানুষ।

উপসংহার: মোঃ সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু)-এর জীবনবৃত্তান্ত স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসেরই একটি গৌরবময় প্রতিফলন। পাবনার এক সাধারণ প্রান্তিক পরিবার থেকে উঠে এসে মেধা, ধৈর্য, রাজনৈতিক ত্যাগ এবং পেশাগত সততার মাধ্যমে তিনি আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হয়েছেন। একজন ছাত্রনেতা থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেখান থেকে দেশের বিচারালয়ের সম্মানিত বিচারক এবং পরবর্তীতে দুর্নীতি দমনের অভিভাবক থেকে হয়ে উঠেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর ভূমিকা ও প্রজ্ঞা বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক অনন্য ও স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন