‘জিন্নাহর বাবা মাছ বিক্রি করতেন, তিনি ছিলেন হিন্দু’: ফজলুর রহমানের দাবি, ইতিহাস কী বলে


প্রকাশিত: ১১:১৫ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পারিবারিক পরিচয় নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান। তার দাবি, জিন্নাহর বাবা মাছ বিক্রি করতেন, তার প্রকৃত নাম ছিল ‘জিন্নাহ পুঞ্জা’ এবং তিনি হিন্দু ছিলেন। তবে প্রচলিত ঐতিহাসিক নথি ও জীবনীতে এসব দাবির কয়েকটির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অমিল পাওয়া যায়।
বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরামের নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফজলুর রহমান এসব কথা বলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি তার পারিবারিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে বক্তব্য দেন।
ফজলুর রহমান বলেন, জিন্নাহর পরিবার গুজরাটের একটি খোজা পরিবার ছিল এবং তারা মাছ বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জিন্নাহর বাবা মাছ বিক্রি করতেন এবং ‘পুঞ্জা’ নামটিও সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিনি জিন্নাহকে হিন্দু হিসেবেও উল্লেখ করেন।
তবে পাকিস্তান সরকারের কায়েদে আজম একাডেমির জীবনীতে জিন্নাহর বাবা জিন্নাহভাই পুঞ্জাকে ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জিন্নাহর পরিবার গুজরাটের কাঠিয়াওয়ারের প্যানেলি এলাকা থেকে করাচিতে আসে এবং তার বাবা সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। মাছ বিক্রেতা হিসেবে তার বাবার পেশার উল্লেখ ওই সরকারি জীবনীতে নেই।
অন্যান্য জীবনীমূলক সূত্রেও জিন্নাহভাই পুঞ্জাকে একজন ব্যবসায়ী বা মার্চেন্ট হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিভিন্ন বিবরণে তার ব্যবসার মধ্যে তুলা, পশম, শস্যসহ নানা পণ্যের বাণিজ্যের কথা পাওয়া যায়। ফলে জিন্নাহর বাবা পেশায় মাছ বিক্রেতা ছিলেন—এ দাবি প্রতিষ্ঠিত জীবনীমূলক সূত্র দিয়ে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
জিন্নাহর নাম নিয়েও ফজলুর রহমানের বক্তব্যের সঙ্গে ঐতিহাসিক নথির পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তান সরকারের সরকারি জীবনী অনুযায়ী, জন্মের সময় জিন্নাহর নাম ছিল Mahomedali Jinnahbhai বা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহভাই। ‘জিন্নাহভাই পুঞ্জা’ ছিল তার বাবার নাম। পরবর্তী সময়ে তিনি Muhammad Ali Jinnah নাম ব্যবহার করেন। তাই ‘জিন্নাহ পুঞ্জা’কে তার প্রকৃত নাম হিসেবে উল্লেখ করার পক্ষে সরকারি জীবনীতে সমর্থন পাওয়া যায় না।
জিন্নাহর ধর্মীয় পারিবারিক ইতিহাস অবশ্য কিছুটা জটিল। তার পরিবার গুজরাটের খোজা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইতিহাসবিদ ডি এন পানিগ্রাহীর গবেষণায় জিন্নাহর পূর্বপুরুষদের হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ এবং পরবর্তী সময়ে পরিবারের ইসলাম গ্রহণ ও মুসলিম পরিচয় দৃঢ় হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে জিন্নাহ নিজে হিন্দু পরিবারে জন্মেছিলেন—এমনটি প্রতিষ্ঠিত জীবনীতে বলা হয়নি। বরং সরকারি পাকিস্তানি নথি তাকে একটি মুসলিম ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেওয়া সন্তান হিসেবে বর্ণনা করে।
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন নিয়েও বক্তব্য দেন ফজলুর রহমান। ঐতিহাসিকভাবে জিন্নাহ প্রথমে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ১৯১৩ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতায় তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯২৯ সালে তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে বিখ্যাত ১৪ দফা উপস্থাপন করেন।
পরবর্তী সময়ে জিন্নাহ মুসলিম লীগের প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন এবং পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি দেশটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হন।
অনুষ্ঠানে ফজলুর রহমান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাঙালিরাও অংশ নিয়েছিল এবং সেই ইতিহাস অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই ভাষার অধিকারসহ বিভিন্ন প্রশ্নে পূর্ববাংলায় বিরোধিতা শুরু হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফজলুর রহমান ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক পথ তৈরি হয়েছিল বলেও বক্তব্য দেন। এগুলো তার অনুষ্ঠানের বক্তব্যের অংশ।
তবে জিন্নাহর পারিবারিক পরিচয় নিয়ে তার বক্তব্যের ক্ষেত্রে দাবি ও নথিভুক্ত ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য জীবনী ও পাকিস্তানের সরকারি নথি অনুযায়ী, জিন্নাহর বাবা জিন্নাহভাই পুঞ্জা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন এবং জিন্নাহর জন্মনাম ছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহভাই। পরিবারের পূর্বপুরুষদের হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও জিন্নাহ নিজে একটি মুসলিম খোজা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
সাম্প্রতিক ডাকসু বিতর্কের মধ্যে জিন্নাহকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক আলোচনা তৈরি হওয়ায় তার জীবন ও পারিবারিক পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য সামনে আসছে। এসব বক্তব্যের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মন্তব্যের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সূত্রের তথ্য আলাদা করে দেখা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
সর্বোচ্চ পঠিত - রাজনীতি
- মেসির বিদায়ে রোনালদোর আবেগঘন বার্তা, জানালেন ‘পূর্ণ শ্রদ্ধা’
- ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ট্রাম্পের নগ্ন ভাস্কর্য ‘অরেঞ্জ প্লেগ’
- ৮ মাস পর চালু, দুই দিনের মাথায় ফের বন্ধ যমুনা সার কারখানা
- রজনীকান্তের ‘জেলার ২’ থেকে বাদ ১০০ মিনিটের বেশি দৃশ্য
- শেষ ম্যাচে গোল-অ্যাসিস্ট, সতীর্থদের ভালোবাসায় বিদায় মেসির
- ওকিনাওয়ায় হত্যা মামলার পর মার্কিন সেনাদের কারফিউ, মদপানে নিষেধাজ্ঞা
- আবরার ফাহাদ হত্যার ৭ বছর, চূড়ান্ত বিচার না হওয়ায় পরিবারের ক্ষোভ
- নারী এল ক্লাসিকোতে বার্সার তাণ্ডব, ৭ গোলে বিধ্বস্ত রিয়াল
- বিজেপিতে যোগ দিলেন কোয়েল মল্লিক, রাজ্যসভায়ও হলেন প্রার্থী
- ১০ বছরের সম্পর্কের ইতি, আলাদা হচ্ছেন প্রীতম-শেহতাজ
- মাছ, মুরগি ও ডিমের বাজারে স্বস্তি নেই, বেকায়দায় নিম্নবিত্তরা
- নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম আবার বাড়ল, ১০ শলাকা এখন ৬৫ টাকা
- প্রেম, অভিমান আর ‘আকাশের ঠিকানায় চিঠি’: রুদ্র–তসলিমার অজানা গল্প
- বাংলাদেশ দলে কাটছাঁট, আসিয়ান কাপের স্কোয়াড থেকে বাদ ৬ ফুটবলার
- র্যাব বিলুপ্ত, যাত্রা শুরু এসআরবির; বদলাবে পোশাক-লোগো-যানবাহনের রং
- জামানত ছাড়াই ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবেন যেসব তরুণ উদ্যোক্তা
- ‘জিন্নাহর বাবা মাছ বিক্রি করতেন, তিনি ছিলেন হিন্দু’: ফজলুর রহমানের দাবি, ইতিহাস কী বলে
- বাংলাদেশের কূটনীতি ও রাজনীতিতে আলোচিত নাম সাকিব আলী
- মেসির রেকর্ড ছুঁলেন রাফিনিয়া, ৭ গোলের রাতে ইতিহাস গড়ল বার্সেলোনা
- বিনামূল্যে এআই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সরকার



