• শুক্রবার , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৩ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কবি সুফিয়া কামাল: যে নারী কলম হাতে বদলে দিয়েছিলেন একটি সময়

কবি সুফিয়া কামাল: যে নারী কলম হাতে বদলে দিয়েছিলেন একটি সময়

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:২৭ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একজন নারী—যাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। এমন এক সময়ে তাঁর বেড়ে ওঠা, যখন মুসলিম পরিবারের নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়াই ছিল কঠিন। অথচ সেই নারীই একদিন হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি, নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত এবং বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরিচিত মুখ।

তিনি কবি বেগম সুফিয়া কামাল।

কেবল কবিতা লিখেই তিনি ইতিহাসে জায়গা করে নেননি। ভাষা, সংস্কৃতি, নারী অধিকার এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে তাঁর দীর্ঘ সক্রিয় জীবন তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে।

শৈশব: স্কুলে না গিয়েও যেভাবে শুরু হয়েছিল শেখা

সুফিয়া কামালের জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর বাবা সৈয়দ আবদুল বারী ছিলেন আইনজীবী এবং মা সাবেরা বানু।

সে সময়ের পারিবারিক ও সামাজিক রীতির কারণে তাঁর নিয়মিত বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। বাড়িতেই তিনি উর্দু, আরবি ও ফারসি শেখেন। আর বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর পরিচয় গড়ে ওঠে মূলত মা ও মামার মাধ্যমে।

অর্থাৎ যিনি পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারী কবি হয়ে উঠবেন, তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল কোনো প্রচলিত স্কুলের শ্রেণিকক্ষে নয়—নিজের ঘরেই।

মাত্র সাত বছর বয়সে যে সাক্ষাৎ জীবনে প্রভাব ফেলেছিল

১৯১৮ সালে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় গিয়ে ছোট্ট সুফিয়ার দেখা হয় বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে।

সুফিয়া কামালের বয়স তখন মাত্র সাত বছর।

নারীশিক্ষা ও নারীজাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার সঙ্গে এই পরিচয় তাঁর পরবর্তী চিন্তাভাবনা ও জীবনদর্শনে প্রভাব ফেলেছিল।

পরবর্তীকালে সুফিয়া কামাল নিজেও নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠকে পরিণত হন।

১২ বছর বয়সে বিয়ে, কিন্তু থামেনি লেখালেখি

মাত্র ১২ বছর বয়সে সুফিয়া কামালের বিয়ে হয় সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে। তবে তাঁর স্বামী সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবায় তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন।

সামাজিক বিধিনিষেধের মধ্যেও সুফিয়া কামাল পিছিয়ে পড়া নারীদের নিয়ে কাজ শুরু করেন। একই সময়ে চলতে থাকে তাঁর বাংলা সাহিত্যচর্চা।

১৯২৩ সালে তাঁর প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’ প্রকাশিত হয়। তখন তিনি কিশোরী।

এটি শুধু একজন নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ ছিল না; এমন একটি সময়ে একজন মুসলিম নারীর সাহিত্যজগতে প্রবেশও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।

কাজী নজরুল ইসলামের উৎসাহে কবিতার জগতে

সুফিয়া কামালের সাহিত্যজীবনের আরেকটি আকর্ষণীয় অধ্যায় জড়িয়ে আছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে।

কলকাতায় থাকার সময় তাঁর পরিচয় হয় নজরুলের সঙ্গে। সুফিয়ার কবিতা পড়ে নজরুল মুগ্ধ হন এবং তাঁকে কবিতা প্রকাশে উৎসাহ দেন।

১৯২৬ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’।

এরপর আর তাঁকে থেমে থাকতে হয়নি।

১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’। পরবর্তী সময়ে বাংলা কবিতায় সুফিয়া কামাল হয়ে ওঠেন পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম।

মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং চরকা কাটা

সুফিয়া কামালের জীবনের একটি তুলনামূলক কম আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯২৫ সালে।

বরিশালে তাঁর দেখা হয় মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধীর স্বদেশি ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে সুফিয়া কামাল চরকায় সুতা কাটেন।

ধীরে ধীরে তাঁর জীবনযাপনেও পরিবর্তন আসে। ছোটবেলার অভিজাত পোশাক ছেড়ে তিনি সাধারণ বাঙালি নারীদের ব্যবহৃত তাঁতের শাড়ির দিকে ঝুঁকে পড়েন।

এই ঘটনা দেখায়, তাঁর সামাজিক চেতনা কেবল লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্যক্তিগত জীবনেও তার প্রভাব ছিল।

সাহিত্যিক সুফিয়া কামাল

সুফিয়া কামালের কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম, ব্যক্তিগত অনুভূতি যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে দেশপ্রেম, সামাজিক বাস্তবতা, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ এবং মানুষের বেদনা।

তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে—

সাঁঝের মায়া
মায়া কাজল
মন ও জীবন
উদাত্ত পৃথিবী
প্রশান্তি ও প্রার্থনা
দিওয়ান
মোর যাদুদের সমাধি পরে
একাত্তরের ডায়েরি

বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি তাঁর রচনায় শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

‘বেগম’ পত্রিকার সঙ্গেও ছিল তাঁর সম্পর্ক

১৯৪৭ সালে কলকাতা থেকে ‘বেগম’ পত্রিকা প্রকাশ শুরু হলে সুফিয়া কামাল এর প্রথম দিকের সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

দেশভাগের পর একই বছর তিনি ঢাকায় চলে আসেন।

ঢাকায় আসার পর তাঁর জীবন শুধু সাহিত্যকে ঘিরে থাকেনি। ধীরে ধীরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা আরও গভীর হয়।

নারী অধিকার আন্দোলনে সুফিয়া কামাল

সুফিয়া কামালের পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা।

১৯৭০ সালে যাত্রা শুরু করা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদ—পরবর্তীকালের বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ—গড়ে ওঠার পেছনে সুফিয়া কামালের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল। সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল নারী-পুরুষের সমঅধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন।

শুধু কবি নন, সাংস্কৃতিক সংগঠকও

সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ছায়ানট, কচিকাঁচার মেলা এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নাম ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোতেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যায়।

একটি পুরস্কার তিনি ফিরিয়েও দিয়েছিলেন

সুফিয়া কামালের জীবন সম্পর্কে সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্যগুলোর একটি হলো—তিনি শুধু পুরস্কার গ্রহণ করেননি, প্রতিবাদ হিসেবে পুরস্কার ফিরিয়েও দিয়েছিলেন।

১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘তামঘা-ই-ইমতিয়াজ’ প্রদান করে।

কিন্তু ১৯৬৯ সালে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সরকারের দমননীতির প্রতিবাদে তিনি সেই রাষ্ট্রীয় সম্মান ফিরিয়ে দেন।

তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সম্মানের চেয়ে নিজের বিশ্বাস ও অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ছিল—এই ঘটনাটি তার একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

সুফিয়া কামালের উল্লেখযোগ্য পুরস্কার

জীবদ্দশায় তিনি দেশে-বিদেশে বহু সম্মাননা লাভ করেন।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার — ১৯৬২
একুশে পদক — ১৯৭৬
মুক্তধারা পুরস্কার — ১৯৮২
বেগম রোকেয়া পদক — ১৯৯৬
স্বাধীনতা পুরস্কার — ১৯৯৭

এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মাননাও লাভ করেন।

সুফিয়া কামাল সম্পর্কে ৭টি কম জানা ও আকর্ষণীয় তথ্য

১. তাঁর নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলশিক্ষা ছিল না, তবু তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি হয়ে ওঠেন।

২. মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি বেগম রোকেয়ার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

৩. তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় কিশোরী বয়সেই—১৯২৩ সালে।

৪. কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতা পড়ে প্রকাশের জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন।

৫. ১৯২৫ সালে তিনি মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন এবং স্বদেশি আন্দোলনের প্রভাবে চরকায় সুতা কাটেন।

৬. পাকিস্তান সরকারের দেওয়া তামঘা-ই-ইমতিয়াজ সম্মান তিনি ১৯৬৯ সালে প্রতিবাদ করে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

৭. ১৯৯৯ সালে মৃত্যুর পর তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নারীর জন্য এ ধরনের রাষ্ট্রীয় সম্মান ছিল প্রথম।

জীবনের শেষ অধ্যায়

১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় সুফিয়া কামালের মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

তাঁকে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন সূত্র তাঁকে বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে এই সম্মান পাওয়া ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মৃত্যুর পরও কেন সুফিয়া কামাল প্রাসঙ্গিক?

সুফিয়া কামালের জীবনকে শুধু ‘একজন কবির জীবনী’ হিসেবে দেখলে তাঁর বিশাল কর্মজীবনের একটি অংশই দেখা হয়।

তিনি এমন একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা সাহিত্যকে সমাজ থেকে আলাদা করে দেখেননি।

একদিকে তিনি লিখেছেন প্রকৃতি, ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে। অন্যদিকে নারীর অধিকার, বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বিষয়েও সক্রিয় থেকেছেন।

তাঁর মৃত্যুর দুই দশক পরও তাঁকে নিয়ে আলোচনা থেমে যায়নি। ২০১৯ সালে তাঁর ১০৮তম জন্মবার্ষিকীতে Google বিশেষ Doodle প্রকাশ করে তাঁকে স্মরণ করেছিল। নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁর সাহিত্য নতুনভাবে পাঠ ও ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করছে।

শেষ কথা

সুফিয়া কামালের জীবন আমাদের সামনে একটি অসাধারণ বৈপরীত্য তুলে ধরে।

যে মেয়েটির নিয়মিত স্কুলে পড়ার সুযোগ ছিল না, সেই মেয়েই একদিন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে সম্মানিত হন।

যে সমাজে নারীর চলাফেরা সীমাবদ্ধ ছিল, সেই সমাজেই তিনি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।

আর যিনি কোমল ভাষায় কবিতা লিখেছেন, প্রয়োজনের সময় তিনিই হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদের দৃঢ় কণ্ঠ।

এই কারণেই সুফিয়া কামাল শুধু বাংলা সাহিত্যের একজন কবি নন—তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নারীজাগরণের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বিজ্ঞাপন