• রবিবার , ১৫ মার্চ, ২০২৬ | ১ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমানকে ঘিরে দিল্লির ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইউটার্ন’: এক যুগ পর উষ্ণ বার্তার পেছনের কূটনৈতিক হিসাব

তারেক রহমানকে ঘিরে দিল্লির ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইউটার্ন’: এক যুগ পর উষ্ণ বার্তার পেছনের কূটনৈতিক হিসাব

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:০৩ ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বিএনপির নেতা Tarique Rahman-কে অভিনন্দন জানান। তিনি লেখেন, সংসদীয় নির্বাচনে নির্ণায়ক জয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তারেক রহমানকে ‘উষ্ণ অভিনন্দন’, এবং এই ফলাফল বাংলাদেশের মানুষের তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থার প্রতিফলন। কিছুক্ষণ পর একই বার্তা বাংলা ভাষায়ও প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে সরাসরি ফোনালাপও হয় দুই নেতার মধ্যে।

বাংলাদেশের গত চারটি নির্বাচনে ফল ঘোষণার পর বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বার্তা পাঠানো একটি প্রতিষ্ঠিত রীতি। Manmohan Singh থেকে শুরু করে মোদি—দিল্লির ক্ষমতায় যে-ই থাকুন না কেন, এই কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পালাবদলে Sheikh Hasina-র নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেয়নি, আর বিএনপি শক্তিশালী অবস্থানে উঠে এসেছে।

যে তারেক রহমানকে নিয়ে দিল্লির মনোভাব একসময় ছিল স্পষ্টতই শীতল, সেই একই নেতার প্রতি এমন দ্রুত ও প্রকাশ্য উষ্ণতা অনেক বিশ্লেষকের চোখে ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইউটার্ন’। অতীতে সৌজন্যমূলক উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও তারেক রহমান প্রত্যাশিত সাড়া পাননি। ২০১৪ সালে মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় এলে, কংগ্রেস-আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতার অবসানে বিএনপির সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি হবে—এমন ধারণা ছিল তারেকের ঘনিষ্ঠ মহলে। এমনকি সে সময় মোদিকে একটি প্রীতি উপহারও পাঠানো হয়, যা দিল্লিতে পৌঁছে দেন বিজেপির তৎকালীন নেতা Vijay Jolly। কিন্তু তখন দিল্লির তরফে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি।

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার Pinak Ranjan Chakravarty পরবর্তীতে উল্লেখ করেন, তৎকালীন সরকারের সংবেদনশীল অবস্থানের কারণে বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ সীমিত ছিল। যদিও আড়ালে ‘ট্র্যাক টু’ পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা চলত—থিংকট্যাংক, অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক বা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তা দিল্লির কৌশলগত বিবেচনায় গুরুত্ব পায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের দৃষ্টিতে একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী বিএনপি সরকারই এই মুহূর্তে বাস্তবসম্মত অংশীদার।

তবে দিল্লি যে সব ইস্যুতে আলাদা অবস্থান নেবে, সেটিও স্পষ্ট। ভারতের শাসক দল বিজেপি বারবার বলছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু—বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা প্রশ্নে তারা আপসহীন থাকবে। ফলে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হলেও, নির্দিষ্ট ইস্যুতে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

এদিকে বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভারতের প্রতি সরাসরি কঠোর ভাষা পরিহার করাও দিল্লির ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। বিএনপি তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ হিসেবে তুলে ধরলেও ভারতবিরোধী তীব্র অবস্থান না নেওয়াকে দিল্লি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছে।

সব মিলিয়ে, এক যুগ আগের দূরত্ব পেরিয়ে আজ তারেক রহমানের প্রতি মোদির দ্রুত অভিনন্দন বার্তা কেবল সৌজন্য নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত। দিল্লি বুঝিয়ে দিয়েছে, বাস্তবতার নিরিখে সম্পর্ক পুনর্গঠনে তারা প্রস্তুত; আর এই প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন তারেক রহমান।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/