• শনিবার , ১৫ আগস্ট, ২০২৬ | ৩১ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রুনা লায়লার জীবনী: জীবন, সংগীত ক্যারিয়ার, জনপ্রিয় গান ও পুরস্কার

রুনা লায়লার জীবনী: জীবন, সংগীত ক্যারিয়ার, জনপ্রিয় গান ও পুরস্কার

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬:১৭ ১৫ আগস্ট ২০২৬

রুনা লায়লা বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের অন্যতম কিংবদন্তি শিল্পী। দীর্ঘ কয়েক দশকের সংগীতজীবনে তিনি শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিজের অসাধারণ কণ্ঠের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। বাংলা, হিন্দি, উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়ে তিনি উপমহাদেশের সংগীতজগতে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর কণ্ঠ, গায়কী এবং মঞ্চ পরিবেশনা তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পরিচিত করে তুলেছে।

রুনা লায়লাকে অনেক সময় ‘কুইন অব মেলোডি’ বা সুরের রানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গান, আধুনিক গান, গজল এবং বিভিন্ন ধরনের সংগীতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর গাওয়া ‘দমাদম মস্ত কালান্দার’ গানটি তাঁকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।

রুনা লায়লার জন্ম ও শৈশব

রুনা লায়লা ১৭ নভেম্বর ১৯৫২ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠার একটি বড় অংশ কেটেছে তৎকালীন পাকিস্তানের বিভিন্ন পরিবেশে। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।

পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং সংগীতের প্রতি আগ্রহ তাঁর ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শৈশব থেকেই তিনি গান শেখা ও সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তাঁর প্রতিভা তাঁকে পেশাদার সংগীতের জগতে নিয়ে যায়।

রুনা লায়লার সংগীতজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি এমন সময়ে পেশাদারভাবে গান শুরু করেন যখন দক্ষিণ এশিয়ার চলচ্চিত্র ও সংগীতশিল্পে প্লেব্যাক গানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা তৈরি হচ্ছিল। সেই সময়েই তাঁর কণ্ঠ শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে।

সংগীতজীবনের শুরু

রুনা লায়লার পেশাদার সংগীতজীবনের সূচনা হয় ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রশিল্পে। খুব অল্প বয়সেই তিনি চলচ্চিত্রের জন্য গান গাওয়ার সুযোগ পান। তাঁর কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য, উচ্চারণ এবং গায়কীর কারণে দ্রুতই তিনি পরিচিতি অর্জন করতে থাকেন।

তৎকালীন পাকিস্তানের সংগীতজগতে তিনি বিভিন্ন জনপ্রিয় শিল্পী ও সংগীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেন। বিশেষ করে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় প্লেব্যাক গানের মাধ্যমে তাঁর পরিচিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

তাঁর গায়কীতে সমকালীন পাকিস্তানি শিল্পীদের প্রভাব থাকলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র স্টাইল তৈরি করতে সক্ষম হন। ফলে রুনা লায়লা শুধু একজন প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ সংগীতশিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হন।

পাকিস্তানের সংগীতাঙ্গনে রুনা লায়লার জনপ্রিয়তা

রুনা লায়লার ক্যারিয়ারের প্রথম বড় সাফল্য আসে পাকিস্তানের সংগীতাঙ্গনে। সেখানে তিনি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগীত অনুষ্ঠান ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন।

পাকিস্তান টেলিভিশনে তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম নিদর্শন ছিল ‘বাজমে লায়লা’ নামের অনুষ্ঠান, যা তাঁর নামকে আরও পরিচিত করে তোলে। তাঁর কণ্ঠ এবং পরিবেশনা পাকিস্তানের শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। Banglapedia-ও তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এই সময়ে তিনি উর্দু ভাষার অসংখ্য গান গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর কণ্ঠে গজল, চলচ্চিত্রের গান এবং আধুনিক সংগীত বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

‘দমাদম মস্ত কালান্দার’ এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি

রুনা লায়লার সংগীতজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ‘দমাদম মস্ত কালান্দার’ গানটির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা। সুফি ধারার এই জনপ্রিয় গানটি তাঁর কণ্ঠে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও তাঁর নাম পৌঁছে দেয়।

গানটির পরিবেশনে তাঁর কণ্ঠের শক্তি, আবেগ ও স্বতন্ত্র গায়কী শ্রোতাদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এর মাধ্যমে তিনি শুধু চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গায়িকা হিসেবে নয়, একজন আন্তর্জাতিক মানের সংগীতশিল্পী হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন।

রুনা লায়লার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি একই সঙ্গে চলচ্চিত্রের গান, গজল, আধুনিক গান এবং বিভিন্ন সংগীতধারায় নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রুনা লায়লার ক্যারিয়ার

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা রুনা লায়লার ক্যারিয়ারেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে। স্বাধীন বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তিনি ধীরে ধীরে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

দেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতশিল্পে তাঁর জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বাংলা চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে তিনি অসংখ্য গান গেয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে রোমান্টিক গান থেকে শুরু করে আবেগঘন ও আধুনিক গান—বিভিন্ন ধরনের গান শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে।

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তাঁর দীর্ঘ উপস্থিতি তাঁকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারী কণ্ঠশিল্পীতে পরিণত করেছে।

বাংলা চলচ্চিত্রে রুনা লায়লা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গান রুনা লায়লার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন সময়ে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন।

তাঁর গাওয়া চলচ্চিত্রের গানগুলো শুধু সিনেমার অংশ হিসেবে নয়, আলাদাভাবেও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। **‘দ্য রেইন’, ‘জাদুর বাঁশি’, ‘অ্যাকসিডেন্ট’, ‘অন্তরে অন্তরে’**সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রের গান তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

চলচ্চিত্রের গানে তাঁর কণ্ঠের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্র ও পরিস্থিতির সঙ্গে আবেগকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। ফলে বিভিন্ন ধরনের গান তিনি নিজের স্বতন্ত্র গায়কীতে পরিবেশন করতে সক্ষম হয়েছেন।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে রুনা লায়লা

বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার রুনা লায়লার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন। তিনি সেরা নারী কণ্ঠশিল্পী বিভাগে একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন।

বিশেষ করে ২০১২ সালে ‘তুমি আসবে বলে’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি সেরা নারী প্লেব্যাক গায়িকার পুরস্কার পান।

এরপর ২০১৩ সালে ‘দেবদাস’ এবং ২০১৪ সালে ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’ চলচ্চিত্রের জন্যও তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পান। ২০১৪ সালের পুরস্কারে তাঁর সঙ্গে একই বিভাগে মমতাজ বেগমও পুরস্কৃত হন।

তাঁর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে দীর্ঘ ক্যারিয়ারেও তিনি নিজের কণ্ঠের শক্তি ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

সংগীত পরিচালক হিসেবেও রুনা লায়লা

রুনা লায়লার প্রতিভা শুধু গান গাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সংগীত পরিচালনাতেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

২০১৮ সালের ‘একটি সিনেমার গল্প’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সংগীত পরিচালক হিসেবে পুরস্কৃত হন।

এই অর্জন তাঁর বহুমুখী প্রতিভার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একজন গায়িকা হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি সংগীত পরিচালনার ক্ষেত্রেও সফলতা অর্জন করেন।

রুনা লায়লার গানের ভাষা

রুনা লায়লার সংগীতজীবনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর বহুভাষিক গান

তিনি বাংলা, উর্দু ও হিন্দিসহ বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়েছেন। এর ফলে তাঁর জনপ্রিয়তা কোনো নির্দিষ্ট ভাষাভাষী শ্রোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

একজন শিল্পীর জন্য একাধিক ভাষায় গান গাওয়া শুধু কণ্ঠের দক্ষতার বিষয় নয়; প্রতিটি ভাষার উচ্চারণ, আবেগ ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। রুনা লায়লা দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এই দক্ষতা সফলভাবে প্রদর্শন করেছেন।

রুনা লায়লার গায়কীর বৈশিষ্ট্য

রুনা লায়লার কণ্ঠের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো শক্তিশালী ভোকাল, আবেগপূর্ণ পরিবেশনা এবং স্বতন্ত্র গায়কী

তিনি উচ্চ স্বরে গান গাওয়ার পাশাপাশি কোমল ও আবেগঘন গানও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিবেশন করতে পারেন। তাঁর কণ্ঠের ব্যাপ্তি এবং গানের আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা তাঁকে অন্যান্য শিল্পীদের থেকে আলাদা করেছে।

তাঁর গান শুনলে অনেক সময় গানের কথার পাশাপাশি কণ্ঠের আবেগও শ্রোতার কাছে আলাদা করে ধরা দেয়। এই বৈশিষ্ট্যই তাঁর দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

রুনা লায়লার জনপ্রিয় গান

দীর্ঘ সংগীতজীবনে রুনা লায়লা অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। তাঁর গানগুলোর অনেকগুলো চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হলেও পরবর্তীতে সেগুলো সাধারণ শ্রোতার কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

তাঁর জনপ্রিয় গানের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে ‘দমাদম মস্ত কালান্দার’, চলচ্চিত্রের বিভিন্ন প্লেব্যাক গান এবং বাংলা ও উর্দু ভাষার অসংখ্য আধুনিক গান।

তাঁর গাওয়া গানগুলোর জনপ্রিয়তা শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মে সীমাবদ্ধ নয়। পুরোনো শ্রোতাদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁর গান এখনো পরিচিত।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রুনা লায়লা

রুনা লায়লা বাংলাদেশের সংগীতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ভারত ও পাকিস্তানে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল এবং বিভিন্ন দেশে তিনি সংগীত পরিবেশন করেছেন।

তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতাঙ্গনে তাঁর পরিচিতি বাংলাদেশের জন্যও একটি সাংস্কৃতিক গৌরবের বিষয়।

খ্যাতিমান গীতিকার ও সংগীত ব্যক্তিত্ব গাজী মাজহারুল আনোয়ার রুনা লায়লার সংগীতপ্রতিভার প্রশংসা করে তাঁকে বাংলাদেশের গর্ব হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

রুনা লায়লার উল্লেখযোগ্য পুরস্কার

রুনা লায়লার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা যুক্ত হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে—

  • বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার – সেরা নারী কণ্ঠশিল্পী
  • বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার – সেরা সংগীত পরিচালক
  • স্বাধীনতা পুরস্কার
  • নিগার অ্যাওয়ার্ড
  • ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড
  • গ্র্যাজুয়েট অ্যাওয়ার্ড
  • সায়গল অ্যাওয়ার্ড
  • রেডিও মিরচি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড
  • লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড
  • মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা
  • বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সম্মাননা

তাঁর পুরস্কারের তালিকা থেকে বোঝা যায়, সংগীতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

রুনা লায়লার ব্যক্তিজীবন

রুনা লায়লার ব্যক্তিজীবনও তাঁর ভক্তদের কাছে আগ্রহের বিষয়। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা ও গায়ক আলমগীরের সঙ্গে বিবাহিত। তাঁদের সম্পর্ক বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সুপরিচিত।

তবে পেশাগত জীবনে রুনা লায়লা সবসময় নিজের সংগীতকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের নানা পর্যায়ে ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে তিনি সংগীতচর্চা চালিয়ে গেছেন।

রুনা লায়লা ও নতুন প্রজন্ম

রুনা লায়লার গুরুত্ব শুধু তাঁর নিজের সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পী তাঁর গান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।

তাঁর গায়কী, মঞ্চ পরিবেশনা এবং দীর্ঘ সংগীতজীবন তরুণ শিল্পীদের জন্য একটি উদাহরণ। বিশেষ করে একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষা ও সংগীতধারায় কাজ করার ক্ষমতা তাঁকে একটি অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।

তিনি প্রমাণ করেছেন যে একজন শিল্পীর জনপ্রিয়তা শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের ওপর নির্ভর করে না; মানসম্মত কাজ এবং দীর্ঘদিনের সাধনা একজন শিল্পীকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে রাখতে পারে।

রুনা লায়লার সংগীতজীবনের বিশেষত্ব

রুনা লায়লার ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

প্রথমত, তিনি খুব অল্প বয়সে পেশাদার সংগীতে প্রবেশ করেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি পাকিস্তানের সংগীতাঙ্গনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর বাংলাদেশের সংগীত ও চলচ্চিত্রেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।

তৃতীয়ত, তিনি একাধিক ভাষায় গান গেয়ে আন্তর্জাতিক শ্রোতা তৈরি করেন।

চতুর্থত, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি শুধু গায়িকা হিসেবে নয়, সংগীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন।

পঞ্চমত, তাঁর সংগীতজীবনে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার যুক্ত হয়েছে।

এই বিষয়গুলোই তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল ও দীর্ঘস্থায়ী সংগীতশিল্পীতে পরিণত করেছে।

রুনা লায়লার উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসে রুনা লায়লার নাম একটি বিশেষ অধ্যায়। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গান কয়েক দশক পেরিয়ে আজও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়।

একজন শিল্পীর প্রকৃত সাফল্য শুধু কতগুলো গান গেয়েছেন বা কতগুলো পুরস্কার পেয়েছেন, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর কাজ পরবর্তী প্রজন্মের ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় রুনা লায়লার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বাংলাদেশের সংগীতকে দেশের সীমানার বাইরে পরিচিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন এবং বাংলা সংগীতের পাশাপাশি উর্দু ও হিন্দি ভাষার শ্রোতাদের কাছেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

রুনা লায়লা সম্পর্কে সংক্ষেপে

নাম: রুনা লায়লা
জন্ম: ১৭ নভেম্বর ১৯৫২
জন্মস্থান: সিলেট, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান
পেশা: সংগীতশিল্পী, প্লেব্যাক গায়িকা ও সংগীত পরিচালক
সংগীতজীবন: ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিক থেকে
প্রধান ভাষা: বাংলা, উর্দু, হিন্দিসহ বিভিন্ন ভাষা
বিশেষ পরিচিতি: প্লেব্যাক, গজল, আধুনিক গান ও সুফি সংগীত
বিশেষ জনপ্রিয়তা: ‘দমাদম মস্ত কালান্দার’সহ অসংখ্য গান
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: সেরা নারী কণ্ঠশিল্পী বিভাগে একাধিকবার
সংগীত পরিচালক হিসেবে পুরস্কার: ‘একটি সিনেমার গল্প’
স্বীকৃতি: দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা

উপসংহার

রুনা লায়লা শুধু বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় গায়িকা নন; তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। কয়েক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি গান গেয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।

পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে ক্যারিয়ারের শুরু থেকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতাঙ্গনে প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিবেশনা, বিভিন্ন ভাষায় গান এবং অসংখ্য পুরস্কার—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ার একটি দীর্ঘ সফলতার গল্প।

তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গান একাধিক প্রজন্মকে আনন্দ দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিভার সঙ্গে অধ্যবসায়, নিয়মিত চর্চা এবং নিজের শিল্পীসত্তার প্রতি নিষ্ঠা থাকলে একজন শিল্পী দীর্ঘ সময় ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেন।

বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে রুনা লায়লার নাম তাই শুধু একজন গায়িকা হিসেবে নয়, বরং একটি সংগীতঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞাপন