• সোমবার , ১৩ জুলাই, ২০২৬ | ২৯ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাত জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে বিপর্যয়, প্রাণহানি বেড়ে ৫১

সাত জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে বিপর্যয়, প্রাণহানি বেড়ে ৫১

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:৫৭ ১৩ জুলাই ২০২৬

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দুর্যোগে প্রাণহানি বেড়ে ৫১ জনে পৌঁছেছে। পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাইয়ের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রোববার দুপুর পর্যন্ত ৫৯টি উপজেলা বন্যার পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩।

এক দিন আগেও দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ছিল ৪৪। সে সময় সাত জেলায় ১০ লাখের বেশি মানুষ আটকা পড়ার তথ্য জানিয়েছিল রয়টার্স। দুর্গম এলাকায় সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ত্রাণ পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

হালনাগাদ হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে ২৮ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৩, বান্দরবানে ছয়, রাঙামাটিতে তিন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে উদ্ধার তৎপরতা চলমান থাকায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব আরও পরিবর্তিত হতে পারে।

মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। কয়েক দিনের অস্বাভাবিক বর্ষণে পাহাড়ি ঢল নেমে বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কোথাও সড়ক ভেঙে গেছে, কোথাও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও নতুন বৃষ্টিতে আবার পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর বহু এলাকায় এখনো বাড়িঘরের ভেতরে পানি রয়েছে। অনেক পরিবার হাঁটু থেকে কোমরসমান পানির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রান্নার ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শুকনা খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেককে।

বন্যার পানিতে নলকূপ ও অন্যান্য পানির উৎস তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হয়েছে। কাঁচা ঘর ধসে পড়া, খাদ্যশস্য নষ্ট হওয়া এবং গবাদিপশুর ক্ষতি দুর্গত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন কিছু এলাকায় রাতে অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।

কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, মাতামুহুরী ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো পানি রয়েছে। কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নতুন করে লোকালয়ে পানি প্রবেশের খবর পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক যান চলাচল বন্ধ থাকায় অনেক এলাকায় নৌকাই একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে।

বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় পানি কমার পর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। গ্রামীণ সড়ক, ছোট সেতু, জুমখেত, সবজিক্ষেত এবং আমন-আউশের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অনেকে বাড়িতে ফিরলেও বসতঘর মেরামত ও জীবিকা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নিচু এলাকাতেও বন্যার বিস্তার ঘটেছে। পানি আরও বাড়বে কি না, তা আগামী কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজানের প্রবাহের ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন বন্যা পূর্বাভাস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, ভাঙা সেতু ও বিচ্ছিন্ন জনপদের কারণে সব মানুষের কাছে সমানভাবে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। আগের দিনও সরকারি সহায়তায় নৌকায় করে খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোর কথা জানিয়েছিল রয়টার্স।

দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষকে পাহাড়ের ঢাল, প্রবল স্রোত, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং পানিতে তলিয়ে থাকা বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন