• বৃহস্পতিবার , ০৯ জুলাই, ২০২৬ | ২৫ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত ফিরছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের বিধান

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত ফিরছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের বিধান

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:৫৪ ৯ জুলাই ২০২৬

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের বিধান বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ হওয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের সাংবিধানিক বিধান পুনর্বহালের পথ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। পঞ্চদশ সংশোধনী সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় চ্যালেঞ্জ করে করা আপিল খারিজ করে দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

রায় ঘোষণার পর মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা এ সিদ্ধান্তকে দেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।

তিন দিনের শুনানি শেষে রায়

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিধান অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি বুধবার শেষ হয়। টানা তিন দিন শুনানির পর আপিল বিভাগ ৯ জুলাই রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেছিলেন।

এর আগে গত বছরের ১৩ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ ওই আদেশ দিয়েছিলেন।

তারও আগে ৩ নভেম্বর পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিলের আবেদন জানিয়ে লিভ টু আপিল করা হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আবেদনটি করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া।

হাইকোর্টের রায়ে যা বলা হয়েছিল

গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করেন।

তবে আদালত পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্তি, গণভোটের বিধান বাদ দেওয়া এবং সংবিধানে যুক্ত কয়েকটি অনুচ্ছেদের বৈধতা নিয়ে পৃথক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় ছিল গণতন্ত্র ও অবাধ নির্বাচনের প্রশ্ন। আদালতের মতে, গণতন্ত্র সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনগুলো জনগণের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রয়োজনীয় আস্থা তৈরি করতে পারেনি। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এর গভীর প্রভাব পড়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্তির বিধান বাতিল

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়েছিল। সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা এ ব্যবস্থার বিলুপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

হাইকোর্ট ওই দুটি ধারাকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেন। আদালতের বিশ্লেষণে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও নির্বাচনী বাস্তবতার ভিত্তিতে সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল এবং একপর্যায়ে তা গণতান্ত্রিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।

আদালত মনে করেন, এ ব্যবস্থা বিলুপ্তির প্রক্রিয়া সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।

গণভোটের বিধানও পুনর্বহালের পথ পেল

পঞ্চদশ সংশোধনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা।

গণভোটের এ বিধান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অংশ ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারার মাধ্যমে সেটি বাদ দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের রায়ে ওই ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে আগের সাংবিধানিক কাঠামোয় থাকা গণভোটের বিধান পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।

আপিল বিভাগের রায়ের পর হাইকোর্টের এ সিদ্ধান্তও কার্যকর থাকার পথ তৈরি হয়েছে।

৭ক, ৭খ ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদ নিয়েও সিদ্ধান্ত

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের ২ দফাও হাইকোর্ট বাতিল করেছিলেন।

৭ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল বা স্থগিত করার মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার বিধান ছিল। অন্যদিকে ৭খ অনুচ্ছেদে সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক বিধানকে সংশোধনের অযোগ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

৪৪(২) অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংসদকে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অন্য আদালতকে নির্দিষ্ট ক্ষমতা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।

হাইকোর্ট এসব বিধানকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সিদ্ধান্ত দেন।

পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হয়নি

আদালতের সিদ্ধান্তে পঞ্চদশ সংশোধনীর সব বিধান বাতিল করা হয়নি। সংশোধনীর মাধ্যমে মোট ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিবর্তন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল।

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, যেসব বিধান সরাসরি বাতিল করা হয়নি, সেগুলোর বিষয়ে ভবিষ্যৎ জাতীয় সংসদ আইন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। প্রয়োজনে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্তন আনার সুযোগ থাকবে।

এসব বিষয়ের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং ২৬ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ-সংক্রান্ত বিধানসহ আরও কয়েকটি বিষয় রয়েছে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল আইনি লড়াই

গত বছরের ১৯ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিধান কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল দিয়েছিলেন। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা রিট আবেদনের প্রাথমিক 

বিজ্ঞাপন