• বৃহস্পতিবার , ২৫ জুন, ২০২৬ | ১১ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীন থেকে J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনায় বাংলাদেশ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন গতি

চীন থেকে J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনায় বাংলাদেশ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন গতি

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২:৩২ ২৫ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে চীনের কাছ থেকে অত্যাধুনিক J-10CE মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা এগোচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হচ্ছে, প্রস্তাবিত এই ক্রয় পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ ২৪টি যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করতে পারে। বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে রূপ না নিলেও দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সরকারি পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরের সময় প্রতিরক্ষা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরকে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সামরিক সরঞ্জাম, উন্নয়ন প্রকল্প এবং শিল্প বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে।

প্রস্তাবিত যুদ্ধবিমান ক্রয় পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। সূত্রের দাবি, J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথে বাংলাদেশ এগোচ্ছে এবং চলতি বছরের মধ্যেই এ বিষয়ে বড় অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। তবে চুক্তির সময়সূচি, অর্থায়ন পদ্ধতি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য বিষয় এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

J-10CE হলো চীনের তৈরি একটি আধুনিক মাল্টি-রোল ফাইটার জেট। এটি আকাশ প্রতিরক্ষা, আকাশ থেকে ভূমিতে আঘাত, নজরদারি এবং বিভিন্ন কৌশলগত মিশনে ব্যবহারযোগ্য বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করেন। বাংলাদেশ যদি এই যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করে, তাহলে বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় এটি একটি বড় সংযোজন হতে পারে।

প্রতিরক্ষা সূত্রের বরাতে বলা হচ্ছে, প্রতিটি যুদ্ধবিমানের সম্ভাব্য মূল্য কয়েক কোটি মার্কিন ডলার হতে পারে। তবে শুধু বিমান ক্রয়ের খরচই চূড়ান্ত ব্যয়ের পুরো চিত্র নয়। প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, সিমুলেটর, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অপারেশনাল সাপোর্ট মিলিয়ে মোট ব্যয় আরও বড় হতে পারে। তাই প্রকৃত প্যাকেজ মূল্য নির্ভর করবে চূড়ান্ত চুক্তির শর্তের ওপর।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন পরিকল্পনায় বহুদিন ধরেই বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সীমান্ত সুরক্ষা, সমুদ্রসীমা নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সংগ্রহের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা অংশীদার। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে চীনা সরঞ্জামের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে নতুন যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনা দুই দেশের সামরিক সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎসের বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত ভারসাম্যের বিষয়েও নতুন বার্তা দিতে পারে।

চীন সফরকালে শুধু প্রতিরক্ষা নয়, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে একাধিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। এসব চুক্তির মধ্যে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন এবং নদী ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত বিষয় থাকতে পারে।

তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা বা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়েও চীনের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা ইস্যু বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ প্রকল্পে চীনা সহযোগিতার সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় আসায় বিষয়টি আঞ্চলিক কূটনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে মংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ এবং সেখানে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা এগোচ্ছে। মংলা বন্দরকে আরও কার্যকর ও বাণিজ্যবান্ধব করে তুলতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে সরকার। চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ শিল্পাঞ্চল তৈরি হলে উৎপাদন খাত, রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের বড় অংশ এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নকে ঘিরে। বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে অনেক বড় কোম্পানি নতুন বিনিয়োগ গন্তব্য খুঁজছে। বাংলাদেশ যদি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তাহলে পোশাক খাতের বাইরে উৎপাদনভিত্তিক শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের এই দ্রুত অগ্রগতি আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে ভারত বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। তাই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় প্রতিরক্ষা বা অবকাঠামোগত চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কিছু অস্বস্তিকর ঘটনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কথাও আলোচনায় এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকার বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের বার্তা দিচ্ছে। অর্থাৎ শুধু একটি শক্তির ওপর নির্ভর না করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে ঢাকা।

পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য রাখা। চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানো যেমন অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখাও সমান জরুরি।

চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য J-10CE যুদ্ধবিমান চুক্তি তাই শুধু একটি সামরিক ক্রয় নয়; এটি বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান, প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনার সঙ্গেও যুক্ত। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বিষয়টিকে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবেই দেখা উচিত।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি এই চুক্তি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে। কারণ আধুনিক যুদ্ধবিমান পরিচালনা শুধু বিমান কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা, প্রযুক্তি, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত পরিকল্পনা জড়িত।

সব মিলিয়ে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান আলোচনা আগামী দিনের কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আলোচনাগুলো কত দ্রুত চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিমান ক্রয় পরিকল্পনা বাস্তবে চুক্তিতে পরিণত হয় কি না।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/