• বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ | ৩ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হারিয়ে যাচ্ছে মাটিতে বসে চুল–দাড়ি কাটার ঐতিহ্য

হারিয়ে যাচ্ছে মাটিতে বসে চুল–দাড়ি কাটার ঐতিহ্য

আলমগীর হোসেন: ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
আলমগীর হোসেন: ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৩:০৫ ২২ অক্টোবর ২০২৫

সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামীণ জীবনের বহু চিরচেনা দৃশ্য। তারই একটি—মাটিতে বসে চুল ও দাড়ি কাটা নরসুন্দরদের দৃশ্য। একসময় বাজার কিংবা গ্রামের মোড়ে মোড়ে দেখা যেত এই নরসুন্দরদের। এখন সেই দৃশ্য দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায়।

আজকাল গ্রামগঞ্জ থেকে শহর—সবখানেই গড়ে উঠেছে আধুনিক সাজের সেলুন। এসি-ফ্যান, আলোর ঝলকানি আর নানা ধরনের হেয়ার কাটিং মেশিনে সাজানো এসব সেলুনে এখন ভিড় বাড়ছে প্রতিদিন। ফলে মাটিতে বসে চুল–দাড়ি কাটা ঐতিহ্যবাহী পেশাটি হারাতে বসেছে।

তবুও ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গড়েয়া বাজার এলাকায় এখনো দেখা যায় সেই পুরোনো দৃশ্য—জলচৌকিতে বা ইটের ওপর সাজানো পিঁড়িতে বসে চুল ও দাড়ি কাটছেন কিছু নরসুন্দর।

গড়েয়া ইউনিয়নের বাগেরহাট এলাকার দুই প্রবীণ নরসুন্দর—কেন্দু শীল (৮০) ও দেবেন বর্মন (৭৫)। তারা দুজন সহযোদ্ধার মতো একসঙ্গে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের অর্ধশত বছর এই পেশায়।

কেন্দু শীল জানান, “আমার তিন ছেলে আধুনিক সেলুনে কাজ করে। কিন্তু তারা আলাদা সংসার করে। আমি এখনও এই পিঁড়িতে বসেই চুল ও দাড়ি কেটে জীবিকা নির্বাহ করি। এটা আমার বাপ-দাদার পেশা, ছাড়তে পারিনি।”

একই কথা জানান দেবেন চন্দ্র বর্মনও। তিনি বলেন, “ছেলেরা সেলুনে কাজ করলেও সংসারের টানে তাদের আয়ে চলে না। তাই বৃদ্ধ বয়সেও রোদে-বৃষ্টিতে বসে এই কাজই করছি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই পেশাই চালিয়ে যাব।”

তাদের পাশে সবসময় থাকে একটি কাঠের বাক্স—যার ভেতরে থাকে ক্ষুর, কাঁচি, চিরুনি, ফিটকিরি, সাবান, পাউডার ও লোশন। অনেক বছর আগে চুল কাটার মজুরি ছিল পাঁচ পয়সা, দাড়ি কাটায় দুই পয়সা। তখন সেই আয় দিয়েই সংসার ভালোভাবে চলত। এখন ৩০ টাকায় চুল ও ১০ টাকায় দাড়ি কেটে দিনশেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের।

তারা আক্ষেপ করে বলেন, “আগে ক্ষুর শান দিতে হতো। এখন সবাই ব্লেড ব্যবহার করে। চুল কাটার মেশিন, শেভিং ক্রিম, লোশন—এসব আমাদের সময় ছিল না। এখন যুগ পাল্টেছে, আমরাও পিছিয়ে গেছি।”

স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল মিয়া বলেন, “এখন বাজারে অনেক আধুনিক সেলুন আছে। কিন্তু যখনই দেখি এই দুই নরসুন্দর চুল কাটছেন, তখন ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। তাদের হাঁটুর ওপর বসে চুল কাটার সময় ঘুমিয়ে পড়তাম—সেই স্মৃতি আজও চোখে ভাসে।”

গড়েয়া ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা জুয়েল ইসলাম বলেন, “আগে বাবা আমাদের ওদের কাছে চুল কাটাতে দিতেন। এখনকার প্রজন্ম হয়তো আর এই দৃশ্য দেখবে না। ভবিষ্যতে হয়তো এটি শুধু গল্পেই থাকবে।”

একসময় গ্রামের প্রতিটি হাটে, মোড়ে, চায়ের দোকানের পাশে দেখা যেত এই নরসুন্দরদের ব্যস্ততা। এখন আধুনিক সেলুনের চাকচিক্যে তারা হারিয়ে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে। তবুও কেন্দু শীল ও দেবেন বর্মন এখনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন এক অদম্য লড়াইয়ে। তাদের চোখে একটাই আশা—
“যতদিন বাঁচবো, ততদিন বাপ-দাদার পেশাটা বাঁচিয়ে রাখবো।”

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/