• মঙ্গলবার , ১৮ আগস্ট, ২০২৬ | ৩ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মালিক বা দোকানদার নেই, টাকা রেখে নিজেই চা বানিয়ে খেতে হয় যে দোকানে

মালিক বা দোকানদার নেই, টাকা রেখে নিজেই চা বানিয়ে খেতে হয় যে দোকানে

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩:৪৮ ১৮ আগস্ট ২০২৬

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চারাতলা বাজারে রয়েছে ব্যতিক্রমী এক দোকান। এখানে নেই কোনো বিক্রেতা বা দোকানদার। ক্রেতারাই নিজেদের প্রয়োজনমতো চা বানিয়ে খান, পছন্দের পণ্য নিয়ে নেন এবং শেষে হিসাব করে টাকা রেখে যান। স্থানীয়দের কাছে দোকানটি পরিচিত ‘সততা দোকান’ বা ‘ভরসার দোকান’ নামে।

চার বছর ধরে মানুষের বিশ্বাস ও সততার ওপর নির্ভর করে চলছে এই অভিনব দোকান।

নিজের চা নিজেকেই বানাতে হয়

সম্প্রতি চারাতলা বাজারের ওই দোকানে ৬৫ বছর বয়সী হারুন অর রশিদকে নিজের চা নিজেই তৈরি করতে দেখা যায়। শুধু নিজের জন্য নয়, সেখানে উপস্থিত অন্যদের জন্যও চা বানাচ্ছিলেন তিনি।

তবে হারুন অর রশিদ দোকানটির মালিক বা কর্মচারী নন। তিনি সাধারণ একজন ক্রেতা হিসেবে চা পান করতে এসেছিলেন।

এই দোকানের নিয়মই এমন—যে আসবেন, প্রয়োজনমতো পণ্য নেবেন, নিজের চা নিজে বানাবেন এবং যাওয়ার সময় হিসাব করে টাকা রেখে যাবেন।

দোকানে নেই কোনো বিক্রেতা

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানে চা, পান, কলা, বিস্কুট, কেকের পাশাপাশি শাক-সবজিসহ বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়। কিন্তু এসব বিক্রি করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দোকানদার সেখানে থাকেন না।

পথচারী কিংবা বাজারের মানুষজন নিজেরাই দোকানে এসে পণ্য নিয়ে নেন। কেউ চা বানিয়ে পান করেন, আবার কেউ অন্যদের জন্যও চা তৈরি করে দেন। এরপর নিজের নেওয়া পণ্যের হিসাব করে টাকা রেখে চলে যান।

কারও কাছে তাৎক্ষণিকভাবে টাকা না থাকলে পরে এসে পরিশোধ করার সুযোগও রয়েছে।

চার বছর ধরে চলছে ‘ভরসার দোকান’

দোকানটির মালিক সমসের আলী। তিনি প্রতিদিন সকালে দোকান খুলে প্রয়োজনীয় মালামাল সাজিয়ে রাখেন এবং চুলা জ্বালিয়ে দিয়ে নিজের মুদি ব্যবসার কাজে চলে যান।

দুপুরে একবার এবং রাতে আবার দোকানে ফিরে এসে সারাদিনের বিক্রির হিসাব করেন। এরপর দোকান বন্ধ করে দেন।

সমসের আলী জানান, অন্যের দোকানে বসে চা খাওয়ার সময় প্রতিদিন তার ২০০ টাকার বেশি খরচ হতো। কিন্তু নিজের দোকানে সবসময় বসে থাকার মতো সময় নেই, আবার দোকানে রাখার মতো কর্মচারীও পাননি। তাই তিনি মানুষের বিশ্বাসের ওপর দোকানটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রতিদিন আয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা

সমসের আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানটি থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, কোনো কোনো সময় দোকানের পণ্য শেষ হয়ে গেলে ক্রেতারাই নিজেদের উদ্যোগে নতুন করে মালামাল কিনে এনে দেন।

এমনকি দোকানে যারা চা পান করতে আসেন, তারা কখনো কখনো দোকানের মালিক সমসের আলীর জন্যও চা বানিয়ে রেখে যান।

ক্রেতারাও রাখছেন বিশ্বাসের মর্যাদা

পায়রাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা মতলেব হোসেন জানান, তিনি নিয়মিত বাজারে আসেন এবং সুযোগ পেলেই এই দোকানে চা পান করেন।

তার ভাষ্য, দোকানে দোকানদার না থাকায় তিনি নিজেই চা বানিয়ে নেন। তখন অন্য কেউ চা খেতে চাইলে তার জন্যও চা তৈরি করে দেন। এরপর নিজের বিলের হিসাব করে টাকা দোকানে রেখে চলে যান।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আফাঙ্গীর হোসেন বলেন, চার বছর ধরে দোকানটি একইভাবে চলছে। সাধারণত কেউ পণ্য নিয়ে টাকা না দিয়ে চলে যান না। দোকানের মালিক যেমন ক্রেতাদের ওপর বিশ্বাস রাখেন, ক্রেতারাও সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দেন।

সততার অনন্য উদাহরণ

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই দোকানটি শুধু চা বা নিত্যপণ্য কেনার জায়গা নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাস ও সততার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

তাদের মতে, বর্তমান সময়ে দোকানে বিক্রেতা না রেখে শুধু মানুষের সততার ওপর ব্যবসা পরিচালনা করা বিরল ঘটনা। সমসের আলীর বিশ্বাস এবং ক্রেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ মিলেই চার বছর ধরে টিকে আছে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

মানুষের প্রতি বিশ্বাস এবং সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার মানসিকতা থাকলে পারস্পরিক জীবনযাপন কতটা সহজ ও সুন্দর হতে পারে—চারাতলা বাজারের এই ‘সততা দোকান’ তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।

বিজ্ঞাপন