• বুধবার , ১৭ জুন, ২০২৬ | ২ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পঞ্চগড়ের ১৯৭১-এর মুক্তাঞ্চল তেতুলিয়া: ইতিহাসে ৫৪ বছরের গৌরবময় ‘২৯ নভেম্বর’

পঞ্চগড়ের ১৯৭১-এর মুক্তাঞ্চল তেতুলিয়া: ইতিহাসে ৫৪ বছরের গৌরবময় ‘২৯ নভেম্বর’

খাদেমুল ইসলাম: পঞ্চগড় প্রতিনিধি
খাদেমুল ইসলাম: পঞ্চগড় প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৫:৫৬ ২৯ নভেম্বর ২০২৫

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে পঞ্চগড়ের নাম যেমন ইতিহাসে অমলিন, তেমনি ২৯ নভেম্বর দিনটি এই জেলার মানুষের কাছে গৌরব, বেদনা ও বিজয়ের এক অনন্য স্মৃতি। ঠিক ৫৪ বছর আগে, ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক-হানাদার বাহিনীর দখলমুক্ত হয় দেশের সর্বউত্তরের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড়। এদিনকে ঘিরে প্রতিবছর জেলা জুড়ে পালিত হয় নানা স্মরণানুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, শ্রদ্ধাঞ্জলি ও আলোচনা সভা। তেঁতুলিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সেই গৌরবময় মুক্তাঞ্চলের স্মৃতি এখনো হৃদয়ে ধারণ করে চলেছে পঞ্চগড়বাসী।

এ বছরও—২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর—জেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের মানুষ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্মরণ করবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ।

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শনিবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর স্মৃতিফলক থেকে শোভাযাত্রা বের হয়ে জেলা পরিষদ কার্যালয়ের বধ্যভূমিতে গিয়ে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ এতে অংশ নেবে। পরে সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা।

১৯৭১ সালে পঞ্চগড়ের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছিল ভিন্নমাত্রার। প্রথমদিকে এই অঞ্চলটি হানাদারমুক্ত থাকলেও, ১৭ এপ্রিল পাকবাহিনী সড়কপথে পঞ্চগড় দখল করে। এ সময় তালমা, অমরখানা, তেঁতুলিয়া ও আশেপাশের এলাকায় মুক্তিবাহিনীর শক্ত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। অমরখানায় চাওয়াই নদীর ব্রিজ ভেঙে দেওয়ায় পাকসেনারা তেঁতুলিয়ায় প্রবেশ করতে পারেনি। ফলে পুরো যুদ্ধকালজুড়ে তেঁতুলিয়া ছিল পাকবাহিনীমুক্ত ‘মুক্তাঞ্চল’। অস্থায়ী সরকারের বহু গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয় তেঁতুলিয়ায়, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

পরে ১ নভেম্বর থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথ অভিযান শুরু করলে পাকবাহিনী দুর্বল হতে থাকে। ২০ নভেম্বর অমরখানা, ২৫ নভেম্বর জগদলহাট, ২৬ নভেম্বর শিংপাড়া, ২৭ নভেম্বর পূর্ব তামলা—এভাবে শত্রুর অবস্থান একে একে ভেঙে পড়ে। ২৮ নভেম্বর রাতে পাকসেনারা দেবীগঞ্জ ও ডোমার হয়ে সৈয়দপুরের দিকে পিছু হটতে থাকে। আর ২৯ নভেম্বর ভোরে মুক্তিযোদ্ধারা পঞ্চগড় শহরে প্রবেশ করে—হানাদারের দখল থেকে পঞ্চগড়ের মুক্তি নিশ্চিত হয়।

২৯ নভেম্বর শুধু একটি জেলার মুক্তিদিবস নয়, এটি ছিল পূর্ব সীমান্তে মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই দিনের মাধ্যমে পঞ্চগড় নতুন করে যোগ দেয় স্বাধীন বাংলার মানচিত্রে—বীরের গৌরব, আত্মত্যাগ ও অগণিত মানুষের স্বপ্নকে ধারণ করে।

পঞ্চগড়ের মানুষ আজও এই দিনটি স্মরণ করে অগাধ গর্ব ও শ্রদ্ধার সঙ্গে—কারণ এই দিনটির মধ্য দিয়েই ১৯৭১-এর বীরগাথা নতুন করে উচ্চারিত হয়, নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায় স্বাধীনতার সংগ্রামের সত্য ইতিহাস।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/