• শুক্রবার , ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ২৭ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংসদে শফিকুর রহমানের কড়া বার্তা: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কারও অধীন নয়

সংসদে শফিকুর রহমানের কড়া বার্তা: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কারও অধীন নয়

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:০৭ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে দেশের পররাষ্ট্রনীতি, সীমান্ত হত্যা, সংবিধান সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার, দুর্নীতি, অর্থনীতি ও শিল্প খাতের সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা আমির শফিকুর রহমান।

বৃহস্পতিবার রাতে সংসদের সমাপনী অধিবেশনে প্রায় ৪০ মিনিটের বক্তব্যে তিনি এসব বিষয়ে তীব্র সমালোচনা ও বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকবে। তবে জাতীয় স্বার্থকে সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনে সমানে সমান লড়াই করার মানসিকতাও থাকতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর কারও অধীন থেকে পরিচালিত হবে না। অতীতে অন্যের নির্দেশনা অনুযায়ী চলার যে অধ্যায় ছিল, তা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি

ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনা বন্ধে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, ফেলানীর মতো আর কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের লাশ কাঁটাতারে ঝুলতে দেখতে চান না। সীমান্ত হত্যা বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ও শক্ত অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে গঙ্গা পানিচুক্তির নবায়ন এবং দীর্ঘদিনের তিস্তা নদীর পানিবণ্টন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে এখন থেকেই সরকারকে কূটনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

‘পালিয়ে যাওয়া অপরাধীরা অপপ্রচার চালাচ্ছে’

বিদেশে পালিয়ে থাকা ব্যক্তিদের প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, যারা অপরাধ করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তারা বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশের পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।

তবে এসব চেষ্টা সফল হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো সৎ মানুষ পালায় না, পালায় কেবল অপরাধীরা।

সংবিধান সংস্কারে গণপরিষদের প্রস্তাব

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায়কে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দেশে যেন ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। সাধারণ পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধন করা হলে ভবিষ্যতে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

এ কারণে গণপরিষদ বা সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জুলাই গণহত্যার বিচার দ্রুত শেষ করার দাবি

জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া বর্তমানে ধীরগতিতে চলছে বলেও অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা।

তিনি বলেন, জুলাই গণহত্যায় নিহতদের পরিবারের যে প্রত্যাশা রয়েছে, সেই অনুযায়ী বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের গড়িমসি না করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বরাদ্দে বৈষম্য না রাখার আহ্বান

সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন বরাদ্দ এবং সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগও তুলে ধরেন শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, ১৮ কোটি মানুষের করের অর্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে দেশের সব এলাকার মানুষের জন্য আনুপাতিক হারে উন্নয়ন কাজ ও বরাদ্দের সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত।

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে আপত্তি

সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত একটি বিল নিয়েও আপত্তি জানান তিনি।

বিলটি কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করে রাষ্ট্রপতিকে এতে স্বাক্ষর না করার জন্য অনুরোধ করেন শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে বিলটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠিয়ে মতামত নেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।

বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন

দেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাতের সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেকে নেমে এসেছে। সময়মতো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।

এর ফলে দেশের শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দখলদারি বন্ধের দাবি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক দখলদারি ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করার আহ্বান জানান শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাব ও সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

স্বাস্থ্য খাতের সংকট নিয়েও বক্তব্য

স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশার কথা তুলে ধরে নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫-এর সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের তীব্র জনবল সংকটের বিষয়টি সংসদে তুলে ধরেন শফিকুর রহমান।

অবহেলিত এই খাতের উন্নয়নে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানান তিনি।

সমাপনী বক্তব্যে দেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে সরকারের প্রতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।

বিজ্ঞাপন