• মঙ্গলবার , ৩০ জুন, ২০২৬ | ১৫ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: হাসপাতালের করিডোর ছেড়ে সংসদের পথে ৪৬ জন চিকিৎসক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: হাসপাতালের করিডোর ছেড়ে সংসদের পথে ৪৬ জন চিকিৎসক

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:২২ ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভোটের সময় এলেই দেশের রাজনীতি নতুন রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। তবে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি দৃশ্য আলাদা করে নজর কাড়ছে—হাসপাতালের করিডোর, রোগীর ভিড় আর চেম্বারের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে ভোটের মাঠে নেমেছেন ৪৬ জন চিকিৎসক। যারা প্রতিদিন মানুষের যন্ত্রণা শোনেন, প্রেসক্রিপশন লেখেন, জীবন বাঁচানোর লড়াই করেন—তারাই এখন ভোটারদের দরজায় দরজায় গিয়ে বলছেন, সংসদে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান আরও বড় পরিসরে।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাটছে তাদের ব্যস্ত সময়। কোথাও ভোট চাইতে গিয়ে অসুস্থ বৃদ্ধের হাত ধরে আশ্বস্ত করছেন, কোথাও আবার রক্তচাপ মেপে দিচ্ছেন প্রচারণার ফাঁকেই। অনেক ভোটার বলছেন, এমন দৃশ্য তারা আগে দেখেননি। চিকিৎসা পেশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানবিক সম্পর্কই এই চিকিৎসক প্রার্থীদের রাজনীতিতে আলাদা করে তুলে ধরছে। নির্বাচন শেষে কয়জন জয়ী হবেন, তা সময়ই বলবে; তবে ভোটের মাঠে তাদের উপস্থিতি ইতোমধ্যে ভিন্ন এক আবহ তৈরি করেছে।

এই রাজনীতিতে আসার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, হতাশা আর জমে থাকা ক্ষোভও। সরকারি হাসপাতালের অতিরিক্ত ভিড়, গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকের সংকট, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ—এসব বাস্তবতার মুখোমুখি তারা প্রতিদিনই হন। অনেক চিকিৎসকই বলছেন, শুধু চিকিৎসা দিয়ে সব বদলানো যায় না; সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় পৌঁছাতে না পারলে কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। সেই উপলব্ধি থেকেই সংসদের পথে হাঁটার স্বপ্ন দেখছেন তারা।

দলভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি চিকিৎসক প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ২০ জন চিকিৎসক মাঠে রয়েছেন। বিএনপি থেকে লড়ছেন ১৩ জন চিকিৎসক, আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে রয়েছেন ১০ জন। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে দুজন এবং স্বতন্ত্র হিসেবে একজন চিকিৎসক নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। সংখ্যার এই হিসাবের বাইরেও চিকিৎসকদের উপস্থিতি এখন ভোটারদের আগ্রহের কেন্দ্রে।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে আশা আর সংশয়ের মিশ্র প্রতিচ্ছবি। সাভারের এক পোশাকশ্রমিক বলেন, “ডাক্তার মানুষ, উনি তো আমাদের কষ্ট বোঝেন। এমপি হলে এলাকার হাসপাতালের দিকে একটু নজর দিলেই অনেক উপকার হবে।” ময়মনসিংহের এক গৃহিণীর আশা, সংসদে চিকিৎসক গেলে অন্তত স্বাস্থ্যখাত নিয়ে কথা বলার একজন মানুষ পাওয়া যাবে। তবে রাজশাহীর এক কলেজশিক্ষক প্রশ্ন তুলছেন, “ডাক্তার ভালো হওয়া এক কথা, রাজনীতি সামলানো আরেক কথা। দলীয় চাপের মধ্যে তারা কতটা স্বাধীন থাকতে পারবেন?”

চিকিৎসক প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা। প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে থেকে মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, ভোট চাইতে এসে চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া—সব মিলিয়ে তার প্রচারণা আলাদা করে নজর কাড়ছে। অনেক তরুণ ভোটার বলছেন, তারা এমন রাজনীতি দেখতে চান যেখানে স্লোগানের চেয়ে কাজ আর মানুষের স্পর্শ বেশি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের বিশ্বাস। রোগী-চিকিৎসকের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যে আস্থা তৈরি হয়, সেটাই এখন তাদের রাজনৈতিক পুঁজি। তবে সংসদে গেলে বাস্তবতা সহজ হবে না—দলীয় সিদ্ধান্ত, আপস আর রাজনৈতিক কৌশলের ভেতর দিয়েই এগোতে হবে। তবু স্বাস্থ্যখাত নিয়ে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচনে ৪৬ জন চিকিৎসকের অংশগ্রহণ শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি মানুষের রাজনীতিতে আস্থার খোঁজের গল্প। ভোটাররা দেখছেন—যারা এতদিন ব্যক্তিগত ব্যথা কমিয়েছেন, তারা এবার কি দেশের অসুখ সারানোর সুযোগ পাবেন? সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে ব্যালট বাক্সই।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/