• শনিবার , ১৫ আগস্ট, ২০২৬ | ৩১ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি নিয়ে হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়

ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি নিয়ে হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪:৪৩ ১৫ আগস্ট ২০২৬

হিন্দু দায়ভাগা আইন অনুযায়ী, ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোন উত্তরাধিকারী বা ‘রিভার্সনার’ হিসেবে স্বত্ব দাবি করতে পারবেন না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত একটি দেওয়ানি রিভিশন আবেদন খারিজ করে অধস্তন আদালতের দেওয়া আগের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন উচ্চ আদালত।

গত ৯ জুলাই বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।

হিন্দু দায়ভাগা আইনে বোনের উত্তরাধিকার দাবি নিয়ে হাইকোর্টের ব্যাখ্যা

‘অমর কুমার দাসের উত্তরাধিকারী লিলি রানী দাস ও অন্যান্য বনাম ড. মনোরঞ্জন মহুরী ও অন্যান্য’ মামলার প্রেক্ষাপটে হাইকোর্ট এ রায় দেন। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলাম।

আদালতে রিভিশন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সমীরণ দাস গুপ্ত। বিবাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী।

বিধবা স্ত্রীর অধিকার সম্পর্কে আদালতের পর্যবেক্ষণ

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট হিন্দু দায়ভাগা আইনের অধীনে বিধবা নারীর সম্পত্তির অধিকার ও উত্তরাধিকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

আদালত বলেন, ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর সম্পত্তিতে বোন উত্তরাধিকারী বা ‘রিভার্সনার’ হিসেবে স্বত্ব দাবি করতে পারবেন না। স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী ওই সম্পত্তিতে আইনগত অধিকার লাভ করেন।

তবে বিধবার সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষমতা আইনগতভাবে সীমিত হলেও তিনি কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করলে সেটি নিয়ে আপত্তি জানানোর অধিকার সবার নেই।

কারা সম্পত্তি হস্তান্তর চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিধবার মৃত্যুর পর যিনি ওই সম্পত্তির পরবর্তী প্রকৃত উত্তরাধিকারী বা ‘রিভার্সনার’ হওয়ার আইনগত যোগ্যতা রাখেন, তিনিই বিধবার করা সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন।

অন্যদিকে, কোনো ব্যক্তির যদি ওই সম্পত্তিতে বর্তমান বা ভবিষ্যৎ আইনগত স্বার্থ না থাকে, তাহলে তিনি সম্পত্তিটি ‘আইনগত প্রয়োজন ছাড়া হস্তান্তর করা হয়েছে’—এমন দাবি করে আদালতে মামলা করার এখতিয়ার রাখেন না।

যে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধ

মামলার নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার রামকান্ত বিশ্বাস ১৯২০ সালে নিজ অর্থে তাঁর ছেলে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের নামে ১ দশমিক ৩৫ একর জমি কেনেন।

রামকান্ত বিশ্বাস জীবিত থাকতেই তাঁর ছেলে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাস মারা যান। পরে ১৯৩৩ সালে রামকান্ত বিশ্বাসও মারা যান।

এরপর সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী সাবিত্রী বালা ১৯৯৬ সালে ওই জমি ড. মনোরঞ্জন মহুরীর কাছে বিক্রি করেন।

১৯৯৮ সালে আদালতে মামলা

সাবিত্রী বালার করা জমি বিক্রির দলিলকে জাল ও প্রতারণামূলক দাবি করে ১৯৯৮ সালে পটিয়ার আদালতে মামলা করেন রামকান্ত বিশ্বাসের মেয়ে শৌল বালা দাস।

মামলায় তিনি ওই সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার স্বত্ব দাবি করেন।

তবে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট আইনি বিষয় পর্যালোচনা করে ২০০০ সালের ২২ জুন পটিয়ার সাব-অর্ডিনেট জজ আদালত শৌল বালার মামলা খারিজ করে দেন।

অধস্তন আদালতের রায়ও বহাল

পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে আপিল করেন শৌল বালা। কিন্তু ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সেই আপিলও খারিজ হয়ে যায়।

এরপর অধস্তন আদালতের রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে ২০০৮ সালে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করা হয়। ওই বছরই হাইকোর্ট এ বিষয়ে রুল জারি করেন।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট সেই রুল খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে পটিয়ার সাব-অর্ডিনেট জজ আদালত ও চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের দেওয়া আগের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন।

হাইকোর্টের রায়ের মূল বিষয়
হিন্দু দায়ভাগা আইন অনুযায়ী ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোন সব ক্ষেত্রে ‘রিভার্সনার’ হিসেবে দাবি করতে পারবেন না।
ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী জীবিত থাকলে তাঁর সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার দাবি করার সুযোগ নেই।
বিধবার মৃত্যুর পর যিনি আইনগতভাবে প্রকৃত রিভার্সনার, তিনিই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সম্পত্তি হস্তান্তর চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন।
সম্পত্তিতে বর্তমান বা ভবিষ্যৎ আইনগত স্বার্থ নেই—এমন ব্যক্তি শুধু ‘আইনগত প্রয়োজন ছিল না’ যুক্তিতে মামলা করতে পারবেন না।
দীর্ঘদিনের মামলায় অধস্তন আদালতের সিদ্ধান্তই বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।

বিজ্ঞাপন