• সোমবার , ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১৩ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলমের গল্প

জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলমের গল্প

মোরনিউজ ডেস্ক
মোরনিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩:৪৫ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সারজিস আলমের পরিচয় শুধু ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের একজন সমন্বয়ক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী থেকে ঢাকায় পড়তে আসা এই তরুণ ছাত্রলীগের প্যানেলে ডাকসুর হল সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে সেই রাজনীতি ছেড়ে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে যুক্ত হন, গণঅভ্যুত্থানের পর কয়েকটি সংগঠনে দায়িত্ব নেন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) হয়ে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

তাঁর এই পথচলার সঙ্গে প্রশংসার পাশাপাশি প্রশ্নও জড়িয়েছে। ছাত্রলীগে থাকার অতীত, পঞ্চগড়ে বড় গাড়িবহর, শ্বশুরের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ এবং আদালত নিয়ে ফেসবুকে মন্তব্য—বিভিন্ন সময়ে এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সারজিসের নিজের বক্তব্য, অন্যদের তোলা প্রশ্ন এবং নথিতে পাওয়া তথ্য আলাদা করে দেখলেই তাঁর জীবন ও রাজনীতির একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া যায়। 

সারজিস আলম কে?

সারজিস আলম বাংলাদেশের একজন রাজনীতিক এবং ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত সমন্বয়ক। তিনি এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এর আগে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক ছিলেন। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী হন তিনি।

সারজিসের জীবনীতে কয়েকটি পরিচয় পরপর এসেছে, একসঙ্গে নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছাত্র প্রতিনিধি ছিলেন; ২০২৪ সালে আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে পরিচিত হন; আন্দোলনের পর সাংগঠনিক দায়িত্ব নেন; এরপর দলীয় ও নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এই সময়ক্রমটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পুরোনো কোনো পরিচয়কে তাঁর বর্তমান পদ হিসেবে দেখালে পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন।

জন্মস্থান ও পরিবারের পরিচয়

প্রকাশিত জীবনীমূলক তথ্য অনুযায়ী, সারজিস আলমের জন্ম ১৯৯৮ সালের ২ জুলাই পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায়। তাঁর বাবা আখতারুজ্জামান সাজু। উত্তরাঞ্চলে এনসিপির দায়িত্ব পাওয়া এবং পরে নিজ জেলার আসনে নির্বাচন করা—দুটি ঘটনাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনে পঞ্চগড়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

পরিবার নিয়ে আলোচনার একটি দিক তাঁর বাবার রাজনৈতিক অতীত। বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সারজিস বলেছেন, তাঁর বাবা স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের একটি পদে ছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ছেলের ভূমিকার কারণে বাবাকে মানসিক চাপ ও হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছিল। এটি সারজিসের নিজের বর্ণনা; পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের রাজনৈতিক অবস্থানকে তাঁর অবস্থান হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বাবাকে ঘিরে ভুল তথ্যও ছড়িয়েছে। একটি ভাইরাল ভিডিওর ব্যক্তিকে সারজিসের বাবা দাবি করা হলেও ঢাকা স্ট্রিমের তথ্য যাচাইয়ে ওই পরিচয়ের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে সেই ভিডিওকে তাঁর পরিবারের ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা ঠিক হবে না। 

পড়াশোনা ও বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু

সারজিস ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়েছেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সংসদ নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া হলফনামাতেও তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি উল্লেখ করেছেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর অমর একুশে হলে তাঁর ছাত্রজীবন শুরু হয়। বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি গণরুমে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আবাসনের সংকট, হলের দলীয় পরিবেশ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে কাজ করার পেছনে এসব অভিজ্ঞতা কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল, সে কথাও তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন। 

২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন তাঁর ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল

সারজিসের রাজনৈতিক পথচলা বোঝার জন্য ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মিছিলে অংশ নিয়ে স্লোগান দিয়েছিলেন। ওই আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক ভাবনায় পরিবর্তন আনে বলে তিনি দাবি করেন। 

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সে সময় ছাত্রলীগের কিছু নেতার কাজ নিয়ে ফেসবুকে প্রশ্ন তোলার পর তাঁকে হলের অতিথি কক্ষে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পোস্ট মুছে ফেলতে চাপ দেওয়া হয়। এসব তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা। ২০১৮ সালে তিনি যে ২০২৪ সালের মতো জাতীয় পর্যায়ের সমন্বয়ক ছিলেন, এমন তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁর নিজের বক্তব্যে ২০১৮ সাল মূলত ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলের একটি সময়।

ছাত্রলীগের প্যানেলে ডাকসু নির্বাচন ও পরে সরে আসা

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সারজিস ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে অমর একুশে হল সংসদে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ওই নির্বাচনে প্রায় ৯০০ ভোটারের মধ্যে তিনি ৬২৪ ভোট পেয়েছিলেন। ভোটসংখ্যাটি তাঁর নিজের দেওয়া তথ্য হিসেবে পড়া উচিত।

পরে ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে তিনি সরে আসেন। বাসসের জীবনীমূলক সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, ২০২২ সালে তিনি সংগঠনটি ছাড়েন। সারজিসের ব্যাখ্যা হলো, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করার যে প্রত্যাশা নিয়ে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে এসেছিলেন, হলের কিছু রাজনৈতিক চর্চার সঙ্গে তার মিল পাননি। এই ব্যাখ্যা তাঁর নিজের; তবে ছাত্রলীগের প্যানেলে নির্বাচন করা তাঁর অতীতের একটি যাচাইযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

এই অতীত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জীবনী থেকে তথ্যটি বাদ দেওয়ার কারণ নেই। একই সঙ্গে ২০১৯ সালের দলীয় পরিচয় দিয়ে ২০২৪ সালের আন্দোলনে তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট নয়। মাঝখানে সংগঠন থেকে তাঁর সরে আসা এবং প্রকাশ্যে দেওয়া ব্যাখ্যাও সময়ক্রমের অংশ।

২০২৪ সালের আন্দোলনের শুরুতে তাঁর ভূমিকা

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে কীভাবে যুক্ত হয়েছিলেন, সে বিষয়ে বাসসকে সারজিস একটি বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ জুন কোটা-সংক্রান্ত আদালতের সিদ্ধান্তের খবর পাওয়ার পর তিনি আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরদিনের কর্মসূচি নিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ৬ জুন শহীদ মিনারমুখী কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি ১ জুলাই থেকে আন্দোলনের বড় পরিসরের কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেছেন। এসব তারিখ ও যোগাযোগের বিবরণ তাঁর সাক্ষাৎকারভিত্তিক।

সারজিসের বর্ণনায় আন্দোলনের একটি মূল দিক ছিল বিভিন্ন হল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একই কর্মসূচিতে যুক্ত করা। তিনি একক নেতার বদলে সমন্বিত কাঠামোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। আন্দোলনের কৃতিত্ব তাই একজনের নামে লেখা যায় না; সারজিস ছিলেন অনেক সমন্বয়ক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে একজন পরিচিত সংগঠক।

আন্দোলন কীভাবে সরকার পতনের দাবিতে পৌঁছায়

কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন জুলাইয়ের সংঘাত, প্রাণহানি ও দমন-পীড়নের পর বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত হয়। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশে শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন।

সারজিস বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এক দফা দাবি হঠাৎ কয়েকজন সমন্বয়কের সিদ্ধান্ত থেকে আসেনি; মানুষের মধ্যে যে দাবি তৈরি হয়েছিল, তাঁরা সেটিকে প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন। এটি ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন। সরকারের পতনকে শুধু তাঁর বা অন্য কোনো একজন নেতার ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করলে আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষের ভূমিকা আড়ালে পড়ে যায়।

ডিবি কার্যালয়ে থাকা ও ‘খাবারের টেবিল’ বিতর্ক

জুলাই আন্দোলনের সময় কয়েকজন সমন্বয়ককে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার কার্যালয়ে রাখা হয়। ওই সময় খাবারের টেবিলে তাঁদের একটি ছবি প্রকাশ্যে আসার পর আন্দোলন প্রত্যাহারের বক্তব্য তাঁরা স্বেচ্ছায় দিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হয়। সারজিস পরে বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল এবং খাবারের টেবিলের ছবি তোলার সময় চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। 

এখানে দুটি বিষয় আলাদা রাখা জরুরি। ছবি প্রকাশের ঘটনা এক বিষয়; ছবি তোলার পরিস্থিতি এবং সে সময় দেওয়া বক্তব্যের স্বাধীনতা নিয়ে সারজিসের অভিযোগ আরেক বিষয়। তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনাকে তাঁর নামে উল্লেখ করাই যথাযথ। তিনি ওই সাক্ষাৎকারে আরও বলেন, ডিবি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর আন্দোলনকারীদের মধ্যে সরকার পতনের দাবি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

আন্দোলনের পর দায়িত্ব: ফাউন্ডেশন, নাগরিক কমিটি ও এনসিপি

গণঅভ্যুত্থানের পর সারজিস জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হন। পরে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এনসিপি গঠিত হলে তাঁকে দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। 

এই তিনটি দায়িত্বের উদ্দেশ্য এক ছিল না। ফাউন্ডেশনের কাজ ছিল আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ঘিরে; নাগরিক কমিটি ছিল একটি সাংগঠনিক পরিসর; আর এনসিপি একটি রাজনৈতিক দল। সারজিসের জীবনীর এই পর্যায়ে আন্দোলনের পরিচয় দলীয় রাজনীতিতে রূপ নেয়। ফলে তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি সংগঠন পরিচালনা, দলীয় সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী কাজও জনসমক্ষে মূল্যায়নের বিষয় হয়ে ওঠে।

সারজিস আলমের বিয়ে ও স্ত্রীর পরিচয়

সারজিস আলম ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি শারমিন আক্তার রাইতাকে বিয়ে করেন। তাঁর শ্বশুর মো. লুৎফর রহমান। শ্বশুরের প্রকাশ্য বক্তব্য অনুযায়ী, দুই পরিবারের উপস্থিতিতে গাজীপুরে সীমিত পরিসরে তাঁদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়। বিয়ের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ে ও জামাতার জন্য দোয়া চান।

সারজিসের বিয়ের খবর প্রকাশের পর স্ত্রীকে নিয়ে পাঠকের আগ্রহ দেখা যায়। তবে রাইতা নিজে রাজনৈতিক দায়িত্বে আছেন, এমন তথ্য এখানে পাওয়া যায় না। তাঁর সম্পর্কে জীবনীতে প্রকাশ্যে নিশ্চিত হওয়া পরিচয় ও বিয়ের তথ্যটুকু রাখাই প্রাসঙ্গিক।

শ্বশুরের বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ও সারজিসের জবাব

২০২৫ সালের আগস্টে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে ২৫ জনের নিয়োগের তালিকায় সারজিসের শ্বশুর মো. লুৎফর রহমানের নাম আসে। একজন পরিচিত রাজনৈতিক নেতার শ্বশুর বিচারপতি হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়োগটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আত্মীয়তার কারণে তাঁর নিয়োগ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত ওই প্রশ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় না।

সমালোচনার জবাবে সারজিস বলেন, তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক হওয়ার আগে থেকেই লুৎফর রহমান আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর দাবি, যোগ্যতা ও বাছাইপ্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই নিয়োগ হয়েছে; শুধু তাঁর আত্মীয় পরিচয় সামনে এনে নিয়োগ বিচার করা অন্যায্য। এটি সারজিসের দেওয়া ব্যাখ্যা। নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য এবং নিয়োগ নিয়ে ওঠা জনস্বার্থের প্রশ্ন—দুটিই আলাদাভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

পঞ্চগড়ে শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে সমালোচনা

২০২৫ সালের মার্চে উত্তরাঞ্চলের দায়িত্ব পাওয়ার পর পঞ্চগড় সফরে সারজিসকে ঘিরে শতাধিক গাড়ির বহর দেখা যায়। এত বড় বহরের খরচ ও নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে এমন আয়োজনের মিল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এনসিপির নেত্রী তাসনিম জারাও পরিষ্কার ব্যাখ্যা চান।

জবাবে সারজিস দাবি করেন, বহরের অর্ধেকের বেশি গাড়ি পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা নিজেদের উদ্যোগে এনেছিলেন। বাকি প্রায় ৫০টি গাড়ি ভাড়া বাবদ প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই ব্যয় বহনের সামর্থ্য তাঁর পরিবারের আছে। এগুলো তাঁর দেওয়া হিসাব ও ব্যাখ্যা; স্বাধীনভাবে নিরীক্ষিত ব্যয়ের বিবরণ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

বিতর্কটি শুধু গাড়ির সংখ্যা নিয়ে ছিল না। আন্দোলনের পর গড়ে ওঠা নতুন দলের নেতারা মাঠের রাজনীতিতে প্রচলিত শক্তি প্রদর্শনের পদ্ধতি গ্রহণ করবেন কি না—সে প্রশ্নও সামনে আসে। সারজিস পাল্টা যুক্তি দেন, ভোটের মাঠে সংগঠনের উপস্থিতি ও সক্ষমতা দেখানোর বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায় না। এখানে তাঁর রাজনৈতিক যুক্তি এবং সমালোচকদের প্রত্যাশার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট।

আদালত নিয়ে ফেসবুক মন্তব্যের পর কী হয়েছিল

উচ্চ আদালত নিয়ে সারজিসের একটি ফেসবুক মন্তব্যকে ঘিরে ২০২৫ সালে আদালত অবমাননার অভিযোগে আবেদন করা হয়। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন আইনজীবী প্রথমে তাঁকে নোটিশ দেন এবং পরে হাইকোর্টে আবেদন করেন। ২০ জুলাই হাইকোর্ট আবেদনটি পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করেন।

এই ঘটনাকে ‘সারজিস আদালত অবমাননায় দোষী সাব্যস্ত’ বলে লেখা ভুল হবে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বক্তব্য নিয়ে অভিযোগ ও আবেদন হয়েছিল; আদালত আবেদনটি নিষ্পত্তি করেছেন। রাজনৈতিক বক্তব্যের ভাষা নিয়ে বিতর্ক এবং আদালতের চূড়ান্ত পদক্ষেপ—দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

নির্বাচনের আগে হলফনামায় কী জানিয়েছিলেন

২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা নিয়ে বাসসের প্রতিবেদনে সারজিসের ঘোষিত আয় ও সম্পদের বিবরণ প্রকাশিত হয়। সেখানে তাঁর নামে বাড়ি, গাড়ি বা ভবন না থাকার কথা উল্লেখ ছিল। হাতে নগদ অর্থ, ব্যাংকে জমা এবং দান হিসেবে পাওয়া কৃষিজমির কথাও প্রতিবেদনে আসে। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি উল্লেখ করেন।

হলফনামার তথ্য নির্দিষ্ট সময়ের ঘোষিত হিসাব। গাড়িবহর নিয়ে তাঁর পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের বক্তব্যের সঙ্গে হলফনামায় তাঁর নিজের নামে ঘোষিত সম্পদ সরাসরি এক জিনিস নয়। পরিবারের অন্য সদস্যের সম্পদকে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ বলা যেমন ভুল, তেমনি হলফনামা দেখে বহরের ব্যয় কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়াও সম্ভব নয়।

পঞ্চগড়-১ আসনে নির্বাচন ও ভোটের ফল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারজিস পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী হন। নির্বাচন কমিশনের ব্রিফিংয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বাসস জানিয়েছে, তিনি পান ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট। বিএনপির প্রার্থী মুহাম্মদ নওশাদ জমির ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৬৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন। ব্যবধান ছিল ৮ হাজার ১২০ ভোট। সারজিসের জন্য এটি ছিল আন্দোলন ও সংগঠনের বাইরে সরাসরি ভোটের মাঠে প্রথম বড় পরীক্ষা। 

ফল ঘোষণার পর তিনি নওশাদ জমিরকে অভিনন্দন জানান। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফল ঘোষণার মঞ্চে বিজয়ী প্রার্থীর পাশে গিয়ে বসেন সারজিস এবং পঞ্চগড়ের ভালো কাজে সহযোগিতার কথা বলেন। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর তাঁর এই আচরণও আলোচনায় আসে।

সারজিস আলমের রাজনৈতিক পথচলা কীভাবে মূল্যায়ন করা যায়

সারজিসের পথচলায় দুটি আলাদা পরীক্ষা দেখা যায়। প্রথমটি ছিল আন্দোলনের: শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করা, ঝুঁকির মধ্যে কর্মসূচি চালানো এবং জাতীয় দাবির সঙ্গে যুক্ত হওয়া। দ্বিতীয়টি নির্বাচনের: একটি দলের প্রতিনিধি হিসেবে ভোটারদের সামনে দাঁড়ানো। প্রথম পরীক্ষায় পরিচিতি পাওয়া দ্বিতীয় পরীক্ষায় জয় নিশ্চিত করে না—পঞ্চগড়-১ আসনের ফল সেটিই দেখিয়েছে।

তাঁর জীবনীর বিতর্কগুলোও একই কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রলীগের প্যানেলে নির্বাচিত হওয়ার তথ্য তাঁর অতীত; গাড়িবহর ও শ্বশুরের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক জীবনের অংশ; আর আদালত অবমাননার আবেদন একটি নির্দিষ্ট আইনি ঘটনা, যার নিষ্পত্তিও হয়েছে। সবকিছুকে এক নামে ‘অভিযোগ’ বা ‘সাফল্য’ লিখলে তথ্যের যথার্থতা নষ্ট হয়।

এক নজরে সারজিস আলম

বিষয়তথ্য
নামমো. সারজিস আলম
জন্মপ্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী ২ জুলাই ১৯৯৮
জন্মস্থানআটোয়ারী, পঞ্চগড়
উচ্চশিক্ষাঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
ছাত্রজীবনের ভূমিকা২০১৯ সালে ডাকসুর অমর একুশে হল সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধি
আন্দোলনে পরিচিতি২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক
আগের দায়িত্বজুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক; জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক
দলীয় দায়িত্বএনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক
স্ত্রীশারমিন আক্তার রাইতা
২০২৬ সালের নির্বাচনপঞ্চগড়-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত

সারজিস আলম সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন

সারজিস আলম কি আগে ছাত্রলীগ করতেন?
হ্যাঁ। তিনি ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে ডাকসুর হল সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে সংগঠনটি ছেড়ে দেন বলে বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। 

২০১৮ ও ২০২৪—দুই কোটা আন্দোলনেই কি তাঁর ভূমিকা একই ছিল?
না। তাঁর নিজের বর্ণনায়, ২০১৮ সালের আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় প্রভাব ফেলেছিল এবং তিনি একটি মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের আন্দোলনে তিনি অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে পরিচিত হন।

সারজিস আলমের স্ত্রী কে?
তাঁর স্ত্রী শারমিন আক্তার রাইতা। তাঁদের বিয়ে হয় ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি। 

সারজিস আলম কি সংসদ সদস্য?
না। ২০২৬ সালের নির্বাচনে তিনি পঞ্চগড়-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও নির্বাচিত হননি। 

আদালত অবমাননার ঘটনায় কি তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন?
উদ্ধৃত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে একটি আবেদন করা হয়েছিল এবং হাইকোর্ট সেটি পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করেছেন। তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে—এমন তথ্য ওই প্রতিবেদনে নেই।

বিজ্ঞাপন